মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়কাদের মোল্লার ফাঁসি : স্বস্তির নিঃশ্বাস নিজ গ্রামেও

কাদের মোল্লার ফাঁসি : স্বস্তির নিঃশ্বাস নিজ গ্রামেও

ন্যাশনাল ডেস্কঃ (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

গত মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির কার্যকর হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে তা স্থগিত হওয়ায় হঠাৎ করেই নিঃস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ফরিদপুরবাসী। আর আজ তারা ফেলছে  স্বস্তির নি:শ্বাস।

৪২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেদিন ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তা স্থগিত হওয়ায় মন ভেঙে যায়  জেলার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষগুলো। সবার কামনা ছিল, ফরিদপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া ‘কসাই কাদের’ বলে কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করার মধ্য দিয়ে তার জন্মের কলঙ্ক ঘুচবে এই জেলার। কিন্তু রায় কার্যকর স্থগিত হওয়ায় শুরু হয় নতুন জল্পনা ও হতাশা। আদৌ এই সরকারের আমলে এ রায় কার্যকর হবে কিনা —এমন শংকা এবং প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয়।

অবশেষে কাদের মোল্লার পক্ষ থেকে করা ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেওয়ায় ও কারা কর্তৃপক্ষ ফের ফাঁসি কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ফরিদপুরবাসী।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। কিন্তু তার আইনজীবীদের আবেদনে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রায় কার্যকর করা স্থগিত করেন।

বুধ ও বৃহস্পতিবার রিভিউ আবেদন গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে এবং রিভিউয়ের মূল আবেদনের (অন মেরিট) ওপর দু’দিনের শুনানি শেষে আসামিপক্ষের দু’টি রিভিউ আবেদনই খারিজ করে আদেশ দেন প্র্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। এর ফলে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পথে আর কোনো আইনগত বাধা না থাকায় ফের ফাঁসির প্রস্তুতি নিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। এ খবরে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে স্বাধীনতার ৪২ বছর পর মনের আগুন কিছুটা নিভতে যাচ্ছে ফরিদপুরবাসীর।

তারা বলছেন, অবশেষে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশের মানুষের বুকের মধ্যে রাজাকারদের জ্বালিয়ে দেওয়া আগুন নিভতে যাচ্ছে। বিজয়ের মাসে সোনার বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা পেতে যাচ্ছেন তাদের জীবনের একটি বড় পুরস্কার। পূরণ হতে যাচ্ছে তাদের জীবনের বড় এক চাওয়ার। বিশেষ করে ফরিদপুরের `কুলাঙ্গার` এই  `কসাই` কাদেরের ফাঁসি হলে এ জেলার আনন্দ-উচ্ছ্বাস হবে সবচেয়ে বেশি।

জেলার সালথা উপজেলার খারদিয়ার বাচ্চু রাজাকার ওরফে মৌলভী  আবুল কালাম আজাদ, সদর উপজেলার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, নগরকান্দার জাহিদ হোসেন খোকন রাজাকার ও সদরপুর উপজেলার আব্দুল কাদের মোল্লার জন্মস্থান হিসেবে কলঙ্কিত ফরিদপুর।  অবশেষে আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির মধ্য দিয়ে কলঙ্ক মোচনের প্রথম ধাপ অতিক্রম করবে।

এ ফাঁসির মধ্য দিয়ে যেমন এ জেলার মানুষ কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হতে যাচ্ছেন, ৪২ বছর ধরে জ্বলতে থাকা শহীদ পরিবারের সদস্য ও নির্যাতিত মা-বোনদের মনের আগুনও তেমনি নিভতে যাচ্ছে কিছুটা। এসব যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এরই মধ্যে। বিচার চলমান নগরকান্দার খোকন রাজাকারের।

বর্তমান সরকারের আমলে এসব রাজাকারের বিচার শুরুর মধ্য দিয়েই কলঙ্কমুক্তির স্বপ্ন দেখেন এ জেলাসহ সারাদেশের মানুষ। তবে রায়ে আব্দুল কাদের মোল্লার প্রথমে যাবজ্জীবন সাজা হওয়ায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বাঙালিরা। রাজপথে নেমে আসে শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ সবাই। দেশের কোটি মানুষ দাবি জানান, সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির।

রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ফাঁসির দণ্ড দেওয়ায় আরেকবার উচ্ছ্বাসে ভাসে সারা দেশ। আর বৃহস্পতিবার রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ায় ও বৃহস্পতিবার ফের কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার প্রস্তুতি চলায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ফরিদপুরবাসী।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামে বাড়ি মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় ও সশস্ত্র বিরোধিতাকারী জামায়াতের এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের। কাদেরের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি চলতে থাকায় এই দিনের অধীর অপেক্ষায় থাকা খোদ তার গ্রামের বাড়ির এলাকার লোকজন  তাদের খুশির কথা বলেছেন।

সদরপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. মোশাররফ হোসেন মিয়া বলেন, এই এলাকার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদেরের ফাঁসির রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ায় আমরা সদরপুর উপজেলাবাসী অত্যন্ত খুশি। যতো দ্রুত সম্ভব এই রায় কার্যকর করতে হবে।

উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল গাফফার বলেন, নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছি। সে সময়ে যারা আমাদের মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছে, নির্বিচারে দেশের মানুষকে খুন করেছে- তাদের বিচার হচ্ছে- এজন্য এই সরকারকে অভিনন্দন জানাই।

মুক্তিযোদ্ধা রনজিৎ কুমার সাহা বলেন, আজ হয়তো অনেকের কাছে মনে হচ্ছে এই বৃদ্ধ লোকটাকে কেন ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে? অথচ এই কাদেররা একাত্তরে যে নৃশংসতা চালিয়েছিলেন, সেসব দিনের কথা মনে হলে আজো আঁতকে উঠি। শুধু তাই নয়, এই কাদের বেঁচে থাকলে দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করবেন তারা। অবশেষ রায় কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আমরা আনন্দিত।

সদরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকির আব্দুস সত্তার বলেন, কাদের মোল্লার মতো ভয়ঙ্কর  মানুষের মৃত্যুদণ্ডই কাম্য ছিল। আগের যাবজ্জীবন রায়ে সারা দেশের মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ও ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার আসামি নূর মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন (অব.) বাবুল বলেন, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর সশস্ত্র হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কাদের মোল্লা।

তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট প্রমাণ করেছেন, তারা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপোসহীন। আর তার রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে ফরিদপুর তথা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া পূরণ হচ্ছে। অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছি যে, এই সরকারের আমলে রাজাকারদের বিচার হচ্ছে।

ফরিদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ বলেন, হাজী শরিয়তুল্লাহ, শাহ ফরিদ (রহ.), জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর  জন্মস্থান পদ্মানদীবিধৌত ফরিদপুর জেলা যেমনি গৌরবান্বিত, তেমনি করে বাচ্চু রাজাকার, মুজাহিদ, খোকন রাজাকার ও কাদের মোল্লার জন্মদাতা হিসেবে কম কলঙ্কিতও নই আমরা।

ফাঁসির রায় হওয়ার পর থেকেই আমরা মুক্তিযোদ্ধারা প্রতীক্ষায় ছিলাম মানবতাবিরোধী নৃশংস অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকা জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার। অবশেষে এই সরকারের আমলেই তা হতে যাচ্ছে। এজন্য বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তিনি বলেন, শুধু কাদের নয়, এরপর বাচ্চু রাজাকার ও মুজাহিদের ফাঁসির রায়ও যতো দ্রুত সম্ভব কার্যকর করতে হবে। ফাঁসি দিতে হবে খোকন রাজাকারকেও। তবেই ফরিদপুর জেলা কলঙ্কমুক্ত হবে।

ফরিদপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর আলতাফ হোসেন বলেন, বিজয়ের মাসে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ এক বড় উপহার। বাচ্চুর ফাঁসির রায় হলেও তিনি পলাতক। তাই আমাদের মনের আশা পূর্ণতা পায়নি। কাদের মোল্লার ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের মধ্য দিয়ে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের পরিপূর্ণ বিচারের উদাহরণ দেখলাম।

সাংবাদিক সালামাত হোসেন খান বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসি হতে যাচ্ছে, এতে ফরিদপুরবাসী খুশি। এই রায় কার্যকর করার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি আমাদের আস্থা আরো আরো দৃঢ় হল। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, এই বিচার তাদেরই শেষ করে যেতে হবে। সরকার পরিবর্তিত হলে রাজাকাররা মাফ পেয়ে যাবে। সেটা হলে এদেশের শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের শেষ ইচ্ছা রাজাকারদের বিচার দেখে যেতে পারবেন না।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ফরিদপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান খোকন বলেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সার্থক হতে যাচ্ছে। ফরিদপুর তথা দেশবাসী আংশিক কলঙ্কমুক্ত হতে যাচ্ছে। কাদের মোল্লার রায় কার্যকরের পর যতো দ্রুত সম্ভব বাচ্চু রাজাকার, মুজাহিদসহ যেসব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় হয়েছে, সেগুলোও কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ `মিরপুরের কসাই“ বলে খ্যাত কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলো। এ আন্দোলনের মুখে সরকার আইন পরিবর্তন করে কাদের মোল্লার এই লঘুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করে মৃত্যুদণ্ড চায়। আপিল শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বদলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ