রবিবার, মে ১৯, ২০২৪
প্রচ্ছদজাতীয়কেবল বাংলাদেশীরাই তাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতে পারে - মার্কিন রাষ্ট্রদূত

কেবল বাংলাদেশীরাই তাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতে পারে – মার্কিন রাষ্ট্রদূত

আপনার দেশে কয়টি অঙ্গরাজ্যে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আছে?’ চিঠির মাধ্যমে পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর করা এ প্রশ্নের জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের সব ক’টিতে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রয়েছে।  আসন্ন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব সংলাপের ওপর গতকাল আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত এ কথা জানান।1st-214 এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো খুবই বীভৎস। এসব ট্র্যাজেডি থেকে একটি প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে আসবে শ্রমিকদের সমাবেশের অধিকার ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ। বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়াটি চলছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘বেটার ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’-এর জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত হচ্ছে। এ কর্মসূচি কম্বোডিয়ার শিল্পকে রক্ষা করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় স্থানীয় আইনানুযায়ী বাংলাদেশকে এ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

উল্লেখ্য, শ্রম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির একটি শুনানি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালুর কথা বলেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় গত সোমবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে লেখা এক চিঠিতে পাটমন্ত্রী জানতে চান, ‘বর্তমানে আপনার নিজের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কয়টি অঙ্গরাজ্যে উৎপাদনশীল শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রয়েছে? ট্রেড ইউনিয়ন থাকা না থাকা অপরিহার্যভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ চিঠিতে মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি সত্যি হতবাক, ট্রেড ইউনিয়ন চালুর বিষয়ে পোশাক শিল্পের মালিকদের ওপর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সরাসরি চাপ সৃষ্টি কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পদমর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তার মন্তব্য সরকারের প্রতি অনধিকারচর্চা, পীড়াদায়ক ও উসকানিমূলক মনে হতে পারে।’ চিঠিতে পত্রিকায় প্রকাশিত মজিনার বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করে অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানান মন্ত্রী। সংলাপপ্রক্রিয়ার গতি খুব ধীর : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে বিদেশীদের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০০৬ ও ২০০৭ সালের চেয়ে ২০১৩ সালের পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কেবল বাংলাদেশীরাই রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতে পারে। রাজনীতিকেরা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুঁজে পেলে উন্নয়ন সহযোগীরা তাতে সহযোগিতা দিতে আনন্দের সাথে এগিয়ে আসবে।

আগামী রবি ও সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব সংলাপের ওপর আলোকপাত করতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নিতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শেরম্যানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসবে। তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও ভারত থেকে আসা একটি মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও যোগ দেবে।

অন্য পক্ষের মনোভাব বুঝতে না পারায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংলাপ জটিল আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, সংলাপ নিয়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছে। এটি সহজ কাজ নয়। তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ যত দ্রুত বের করা যায় ততই মঙ্গল।

মজিনা বলেন, বাংলাদেশকে রাজনৈতিক স্থবিরতার খেসারত দিতে হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিনিয়োগ এখন অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। মতপ্রকাশের উপায় শান্তিপূর্ণ হতে হবে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি (টিকফা) সই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশকে দেয়া সাধারণ অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা (জিএসপি) বহাল রাখার পূর্বশর্ত নয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, টিকফার আওতায় দুই দেশ বছরে অন্তত একবার বৈঠকে বসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাধাগুলো দূর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বহু দেশের এ ধরনের চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ ভালো মনে করলে এই চুক্তিতে সই করবে, আর নয়ত তা থেকে বিরত থাকবে। এর সাথে জিএসপির কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে এ সংক্রান্ত শুনানিতে অংশ নিয়েছে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরেও এ ব্যাপারে মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই জিএসপি-সংক্রান্ত পর্যালোচনার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে ৮৪ লাখ ঋণগ্রহীতা রয়েছেন যাদের বেশির ভাগই নারী। আশা করি ব্যাংকটিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কতটুকু জানতে চাওয়া হলে মজিনা বলেন, এ জন্য বাংলাদেশকে ২০টি শর্ত পূরণ করতে হবে। এতে নারীশিক্ষাসংক্রান্ত বাংলাদেশের দেয়া তথ্যটি পুরনো বলে তিনি মন্তব্য করেন।

হেফাজতে ইসলাম এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো চরমপন্থা উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে কি না জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতে বাংলাদেশ চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে। ২০০৫ সালে দেশজুড়ে বোমা বিস্ফোরণের পর অনেকেই চরমপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা করেছিল। তবে পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। সন্ত্রাসবাদ দমনে ভারতের সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশ কাজ করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন অংশীদারিত্ব সংলাপের ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, ওয়েন্ডি শেরম্যানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে অর্থনীতিবিষয়ক সহকারী সচিব, দক্ষিণ ও মধ্য-এশিয়া বিষয়ক উপসহকারী সচিব, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক উপসহকারী সচিব এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকবেন। সংলাপের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ও চুক্তি সই হতে পারে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী চুক্তিও থাকতে পারে। রাষ্ট্রদূত বলেন, সংলাপের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা, অভিন্ন মূল্যবোধ ও কিছু ক্ষেত্রে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে জোরদার প্রচেষ্টা চলানো হবে। এতে উন্নয়ন ও সুশাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততাÑ এই চারটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হবে। সংলাপে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রসচিব শহিদুল হক।

এক প্রশ্নের জবাবে মজিনা বলেন, অংশীদারিত্ব সংলাপে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচন নিয়ে আলাপ হতে পারে। মার্কিন প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সাথে সাক্ষাৎ করবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ