সোমবার, মে ২০, ২০২৪
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনজামায়াত-শিবিরের আগুনে পুড়ে কাতরাচ্ছে ওরা

জামায়াত-শিবিরের আগুনে পুড়ে কাতরাচ্ছে ওরা

‘‘ও মা, ও মা, মা’রে…।”

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন জামাল উদ্দিন। শিবিরের ছোঁড়া ককটেলে তার ডান পায়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষত। ব্যান্ডেজ দিয়েও পায়ের রক্ত ঝরা বন্ধ করা যাচ্ছিল না। অবিরত রক্তক্ষরণে লাল হয়ে উঠেছিল পরনের সাদা প্যান্টও, এমনকী হাসপাতালের সাদা বিছানাও।

সকাল সোয়া ১১টা। ওই সময় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে থাকার কথা ছিল জামালের। কিন্তু এর বদলে তার ঠাঁই হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে। শিবিরের ককটেল নিক্ষেপে তার এ পরিণতি।

জামায়াত-শিবিরের দেওয়া আগুনে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে ট্রাক চালক কামাল উদ্দিন ও হেলপার মোহাম্মদ ইউসুফকে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে সোমবার ভোর রাতে সীতাকুন্ডে তাদের ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের চমেক হাসপাতালের বার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে সোমবার সকালে।

‘বাজে ধরনের আঘাত পায়ে’

বন্দরনগরীর আগ্রাবাদের এক্সেস রোড এলাকায় টেলিকমের দোকান রয়েছে জামাল উদ্দিনের।

প্রতিদিনের মত সোমবার সকালেও দোকান খুলছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে দোকানের সামনে ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটে। আর তাতেই ডান পায়ে গুরুতর আঘাত পান জামাল। আঘাতের তীব্রতায় সেখানে পড়ে যান তিনি। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

হাসপাতালের ওয়ার্ডে জামালের চিকিৎসায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন চিকিৎসকরা। তখন বাইরে অপেক্ষা করছিলেন জামালের চাচা আবদুস সাত্তার। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে। জানান ভাইপোর পরিবার ও ব্যবসার কথা।

আবদুস সাত্তার বলেন, ‘সে দোকান খুলতে গিয়েছিল। কারও ক্ষতি করতে তো আর যায়নি। তারপরেও কেন তার এমন পরিণতি! কী অপরাধ ছিল আমার ভাইপোর?’

ককটেল নিক্ষেপকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন, ‘ককটেল ফুটিয়ে-বোমা মেরে মানুষের ক্ষতি করা, কোন ধরণের রাজনীতি। আমরা রাজনীতির নামে এ ধরণের সহিংসতা চাই না।’

জানা গেছে, পাঁচ-ছয় বছর আগে ব্যবসা শুরু করেন জামাল। টানাটানির সংসারে বউ আর চার বছরের ছেলে জোনায়েদকে গ্রামের বাড়িতে রেখে নিজে থাকেন একটি মেসে।

ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার সুপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাকের পুত্র। দু’ভাই ও তিন বোনের মধ্যে জামালের অবস্থান মেঝ।

জামালের পায়ের আঘাত সম্পর্কে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালেহ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘প্রাথমিক অবস্থায় মনে হচ্ছে, জামালের পাযের আঘাত খুবই বাজে ধরণের।’

অপারেশনের পর জামালের পায়ের অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানান এ চিকিৎসক।

নগর পুলিশের ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার উখ্য সিং  বলেন, ‘শিবিরের মিছিল থেকে ছোঁড়া ককটেলে জামাল উদ্দিনের পায়ে গুরুতর জখম হয়েছে।’

পুড়েছে শরীর

সিমেন্ট আর রড নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন ট্রাক চালক কামাল উদ্দিন। তার সঙ্গে ছিলেন হেলপার মোহাম্মদ ইউসুফ।

সোমবার ভোরে সীতাকুন্ড সদর এলাকা পার হওয়ার সময় আক্রমণ করে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। তাদের ট্রাকে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।

এতে দু’জনেরই শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে গেছে। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে তারা এখন কাতরাচ্ছেন চমেক হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে।

মোহাম্মদ ইউসুফের বড়ভাই মোহাম্মদ ইসমাঈল বলেন, ‘ভাইয়ের অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনাটি ভোর ৪টার দিকে পুলিশ আমাদের ফোন করে জানায়। আমরা জেনেছি, ক্যাডাররা ট্রাকের চালকের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতেই দু’জনের শরীর ঝলসে যায়।’

বার্ণ ইউনিটের মেডিকেল অফিসার মিশমা ইসলাম বলেন, ‘দু’জনের অবস্থা একটু গুরুতর। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে।’

মিশমা ইসলাম বলেন, ‘ট্রাক চালক কামাল উদ্দিনের শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার দু’হাত, বুক, পিঠের অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। আগুনে তার দু’চোখে আঘাত লেগেছে। এর মধ্যে ডান চোখের অবস্থা খুবই খারাপ।’

এছাড়া মোহাম্মদ ইউসুফের প্রায় ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি। ইউসুফের দু’হাত, ডান পা, পিঠ ও বুকের কিছু অংশ আগুনে পুড়েছে বলে জানান মিশমা ইসলাম।

দু’জনের গ্রামের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার লালপুর গ্রামে বলে জানান কামাল উদ্দিনের ভাগিনা আবদুল মান্নান সুমন।

চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে কামালের অবস্থান তিন নম্বরে এবং চার ভাই ও দু’বোনের মধ্যে ইউসুফের অবস্থান তিন নম্বরে।

বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের টানা ৩৬ ঘণ্টা হরতালের শেষদিন গত ২৮ মার্চ সকালে নগরীর মোমিন রোডের হেমসেন লেইনের মুখে হরতাল সমর্থকদের ছোঁড়া ককটেলে ডান চোখে গুরুতর আঘাত পায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী অন্তু বড়ুয়া।

এর আগে ১২ মার্চ নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে শিবির ক্যাডারদের ছোঁড়া ককটেলে ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্র সুজন দেবনাথের।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ