মঙ্গলবার, মে ২১, ২০২৪
প্রচ্ছদআরো খবর......মহিমান্বিত সৌভাগ্যের রজনী

মহিমান্বিত সৌভাগ্যের রজনী

shab-e-baratশা’বান মাস প্রচুর কল্যাণ ও নেকীর মাস। শা’বান অর্থ শাখা প্রশাখা বের হওয়া এবং অন্য অর্থে পাহাড়ে গমন পথ বা কল্যাণের পথ। অর্থাৎ এ মাসে প্রচুর কল্যাণ ও নেকীর শাখা প্রশাখা রয়েছে। এ মাসের একটি বিশেষ রাত মধ্য শা’বানের বা ১৫ই শা’বানের রাত। আরবি দিন মাস গননার হিসাবে রাতকে অগ্রগামী ধরা হয়, সে হিসেবে ১৪ই শা’বান দিবাগত রাতই ফজিলত পূর্ণ রাত।

ইমাম দায়লামি(রঃ) হযরত আয়েশা(রঃ) এর সুত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রাসুল(সঃ) বলেন চার রাতে আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রচুর রহমত বর্ষণ করেন-১.ঈদুল ফিতরের রাত, ২.ঈদুল আযহার রাত, ৩.অর্ধ শা’বানের রাত, ৪.রজবের রাত।

ইমাম সুবুকি(রঃ) তার তাফসির গ্রন্থে লিখেছেন শবে বরাতে ইবাদত করার উসিলায় সারা বছরের,জুম’আর ইবাদতের দ্বারা সারা সপ্তাহের এবং শবে ক্বদরের ইবাদত দ্বারা সারা জীবনের গুনাহ মাফ হয়।
এজন্যই শবে বরাতের রাতকে গুনাহ মাফের রাত বলা হয়। এরাতকে মাগফেরাতের রাত ও বলা হয়। ইমাম আহমেদ(রঃ) বর্ণনা করেন আল্লাহ্‌র রাসুল(সঃ) বলেছেন এ রাতে মুসরিক ও হিংসুক এই দু শ্রেণীর লোক ছাড়া সবাইকে মহান আল্লাহ্‌ ক্ষমা করে দেন।

এরাতকে শাফায়াতের রাত ও বলা হয়। হাদিসে শরিফে আছে শুধুমাত্র দুষ্ট প্রকৃতির লোক ছাড়া আর সকল লোকদের জন্য শাফায়াতের দোয়া কবুল হয়।

একে মুক্তির রাত ও বলা হয়। হাদিস শরীফের এক বর্ণনায় হযরত আয়েশা(রঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ(সঃ) একাগ্র মনে এ দোয়া করতে শুনেছেন যে,–“ হে আল্লাহ্‌! আমার দেহ, আমার ধ্যান-ধারনা, চিন্তা-চেতনা আপনার জন্য সেজদাবনত। আমার অন্তঃকরন আপনার প্রতি ঈমান এনেছে। এ আমার হাত যা দ্বারা আমি কোন অপরাধ করি। হে ক্ষমাকারী! আমার বড় বড় গুনাহসমুহ মাফ করে দিন। আমার চেহারা তাকেই সেজদা করে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন,আকৃতি দিয়েছেন, কর্ণ ও শ্রবণ শক্তি, চক্ষু ও দৃষ্টি শক্তি দান করেছেন, আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি মাথা তুলে এ দোয়া পড়েন-“হে আল্লাহ্‌! আপনার ভয়ে ভীত, শিরক থেকে মুক্ত, গুনাহ থেকে স্বচ্ছ অন্তর আমাকে দিন যার মধ্যে কুফরের লেশ মাত্র না থাকে, যে অন্তর কোনোদিন বঞ্চিত দুর্ভাগা না হয়। অতঃপর তিনি আবার সেজদায় গেলেন এ সময় আমি তাকে এ দোয়া পড়তে শুনেছি—“হে আল্লাহ্‌! আপনার রোষ অসন্তুষ্টি থেকে আপনার সন্তোষের আশ্রয় চাই। আপনার আজাব ও গজব থেকে আপনার ক্ষমার আশ্রয় চাই। আপনার ক্ষোভ থেকে আপনার রহমতের মিনতি করছি। আপনার প্রশংসা করে শেষ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি তেমনি যেমন আপনি নিজের প্রশংসা করেছেন। আমি তাই বলি যা আমার ভাই দাউদ বলেছিলেন, আমি আমার রবের জন্য আমার মুখমণ্ডল মাটিতে স্থাপন করি, এতে আমি তার ক্ষমা অবশ্যই পেতে পারি। অতঃপর তিনি মাথা তুললেন। আমি নিবেদন করলাম হে আল্লাহ্‌র রাসুল(সঃ) আপনার ওপর আমার পিতা মাতা কোরবান হোক, আপনি কি করছেন আর আমি কি ভাবছি। রাসুল(সঃ) বললেন ,হে হুমায়রা!(হযরত আয়েসা(রঃ) এর বিশেষ নাম যে নামে শুধু আল্লাহ্‌র রাসুল(সঃ) ডাকতেন) তুমি কি জাননা, আজকের এ রাত অর্ধ শাবানের রাত এ রাতে আল্লাহ্‌ তা’আলা ছয় শ্রেণীর লোক ছাড়া বনি কালব গোত্রের অসংখ্য ছাগলের পশমের পরিমাণ লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। যাদের কে আল্লাহ্‌ তা’আলা মাফ করবেন না তারা হল- মদ্যপায়ী, পিতা-মাতার অবাধ্য, ব্যাভিচারি, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, ফেতনাবাজ ও চোগলখর। অন্য এক বর্ণনায় ফেতনাবাজের স্থলে প্রাণীর ছবি অংকনকারীর কথা বলা হয়েছে।

এ রাতকে তকদিরের রাত ও বলা হয়। হযরত আতা ইবন ইয়াসার(রঃ) বলেন এক শা’বান থেকে পরবর্তী শা’বান পর্যন্ত যারা মৃত্যু বরন করবে, তাদের নামের তালিকা এ অর্ধ শা’বানের রাতে মৃত্যুর ফেরেশতার কাছে হস্তান্তর করা হয়। অথচ এ মুহূর্তে তাদের কেউ ক্ষেত-খামারে ব্যস্ত থাকে, কেউ বিয়ে করতে থাকে, কেউ ইমারত তৈরিতে ব্যস্ত থাকে অন্য দিকে মালাকুল মউত আল্লাহ্‌র হুকুমের অপেক্ষায় থাকে। হুকুম হওয়া মাত্র তার রূহ কবজ করে নেবে।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, অর্ধ শা’বানের রাতই বুজুর্গানে দিনের বর্ণনার শবে বরাতের রাত। এক মহিমান্বিত সৌভাগ্যের রজনী। যে রাতে বান্দার পরবর্তী এক বছরের হায়াত, মউত, রিজিক, শাফায়াৎ, রহমত, ক্ষমা ও গুনাহ মাফের দরখাস্ত কবুল করা হয়। সহিহ হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমানিত যে, মহান আল্লাহ্‌ এ রাতে তার বান্দার কাছ থেকে দোয়া আহ্বান করেন সেই সাথে দোয়া কবুলের ও প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহ্‌ দিয়েছেন। হাসান ইবন আলী খাল্লাল(রঃ) হযরত আলী ইবন আবু তালিব(রঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখের রাত আসবে, তখন তোমরা এ রাতে নামাজ পড়বে এবং এ দিনে রোজা রেখ। কেননা সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ্‌ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে অবতরণ করেন। তারপর বলেন, আমার কাছে কেউ ক্ষমা প্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কোনো জিবিকার সন্ধানী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দেব। কোন রোগগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে নিরাময় দান করবো। এভাবে তিনি বলতে থাকেন, অবশেষে ফজরের সময় হয়ে যায়। সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস নম্বর-১৩৮৮।

তাই যেহেতু কোনো নিশ্চয়তা নেই, আগামী এক মুহূর্ত বাঁচার, কেউ জানেও না সে কতক্ষণ বাঁচবে, বা সৌভাগ্যবশত কোনো ভালো আমল করতে পারবে অথবা অসুস্থ হয়ে শারীরিকভাবে ইবাদতের অযোগ্য হয়ে যাবে না। তাই আসুন যে টুকু মুহূর্ত জীবনের সুস্থ, জ্ঞানসম্পন্ন ও যে কোনো সমস্যা মুক্ত সে মুহূর্তে যদি আমাদের কেউ এই মহিমান্বিত সৌভাগ্যের রজনী শবে বরাতে ইবাদতের সুযোগ পাই তা যেন অবহেলায় নষ্ট না করি। সারা রাত যেন ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্‌ যে সুযোগ তার বান্দাদের দিয়ে থাকেন তার সুযোগ গ্রহণ করি এবং এ ও প্রার্থনা করি যেন আমাদের সকলকে মহান আল্লাহ্‌ ঈমানের সাথে মৃত্যু নসীব করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ