বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৪
প্রচ্ছদইন্টারভিউপ্রেমিকা থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী

প্রেমিকা থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী

fffচাকরি খুঁজতে গিয়ে শাকুর সঙ্গে পরিচয়। আটকে পড়ে তার প্রলোভনের জালে। প্রেম থেকে শুরু করে লিভ টুগেদার। সেখান থেকেই খেতাব, পাক্কা ইয়াবা কন্যা’র। নাম তার ম্যানিলা চৌধুরী (২২)। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে

গ্রেপ্তার করেছে। তার সঙ্গে আছে আরও বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী। তাদের হেফাজত থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ম্যানিলা জানায়, সে অধ্যয়ন করছে সরকারি তিতুমীর কলেজে। ফিন্যান্স বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আগামী মাসেই তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু তার আগেই ধরা পড়েছে গোয়েন্দা পুলিশের জালে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে কয়েক হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট। একে একে ধরা পড়েছে তার আরও ৫ সহযোগী। এদিকে একই দিন র‌্যাবের হাতে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানি টিমের দুই নারীসহ আরও ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে এক কেজি তিন শ’ গ্রাম হেরোইন ও জাল টাকা। গার্মেন্ট পণ্য আন্ডারওয়ারের মাধ্যমে তারা বিদেশে পাচারকালে ধরা পড়ে।

গোয়েন্দারা জানান, ইয়াবাকন্যা ম্যানিলা ২০০৫ সালে চট্টগ্রামের একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের একটি কলেজ থেকে পাস করে এইচএসসি। এরপর ঢাকায় এসে তিতুমির কলেজের ফিন্যান্স বিভাগে ভর্তি হয়। তখন তার বাসা ছিল বিমানবন্দর সংলগ্ন কাওলা এলাকায়। ২০১০ সালে তার পিতার পরিচয়ে সূত্র ধরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল শুক্কুর ওরফে শাকুর সঙ্গে পরিচয়। এরপর তার নানা প্রলোভনের জালে আটকে পড়ে। গড়ে ওঠে তাদের প্রেমের সম্পর্ক। শুরু করে লিভ টুগেদার। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে, শাকু পেশাদার অপরাধী। রাজধানীর শুক্রাবাদে ব্র্যাক ব্যাংক ডাকাতি মামলার অন্যতম আসামি। ম্যানিলাকে বিয়ের আশ্বাস দিলেও বিয়ে করেনি। নামায় ইয়াবা ব্যবসায়। একপর্যায়ে ২০১১ সালে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। পরে জেল থেকে ছাড়া পায়। গেয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, গত তিন বছরে দেড় লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করেছে। ইয়াবা আনে মিয়ানমার থেকে। এছাড়া চট্টগ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। প্রতি পিস ইয়াবা কিনত ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। আর ঢাকায় বিক্রি করতো ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। শুক্কুরের পাঠানো ইয়াবার টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংকের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পাঠাতো। পরে নিজেই চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। কখনও ট্রেনে, কখনও বাসে বহন করতো। ম্যানিলার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকায়। সংসারে তার বাবা নেই। আছে মা ও ছোট বোন। বাবা এক সময় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। তিনি কয়েক মাস আগে মারা যান। বছর খানেক আগে রাজধানীর শ্যামলী থেকে ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। এরপর কারাবাস। সাড়ে নয় মাস কারাবন্দি থেকে বছর খানেক আগে জামিনে ছাড়া পায়।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি মশিউর রহমান বলেন, দুই সপ্তাহ আগে আরেক নারী ইয়াবা ব্যবসায়ী লিপিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে সে কেন্দ্রীয় কারাগারে। লিপির বাড়ি কুমিল্লায়। সে ইয়াবা ব্যবসার জন্য টাকা দাদন দিতো। লিপির সঙ্গে জেলখানায় ম্যানিলার পরিচয়। তার কাছ থেকে তথ্য নিয়েই ম্যানিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও ৫ মাদক ব্যবসায়ীকে কমলাপুর ও বনশ্রী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হচ্ছে- তাহের (৪৮), কুলসুম (৩২), জানে আলম (৪৫), খালেদ (৩০) ও আসিফ (২৪)। তাদের হেফাজত থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় পয়ষট্টি লাখ টাকা। গোয়েন্দারা জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চকবাজার থানাধীন নাজিমুদ্দিন রোডের হোটেল নীরব এর সামনে থেকে জানে আলম ও আসিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৯ হাজার পিস ইয়াবা। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রামপুরার বনশ্রী এলাকা থেকে কুলসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৪ হাজার পিস ইয়াবা। তার দেয়া তথ্য অনুয়ায়ী কমলাপুরস্থ মতিঝিল থানা এলাকা থেকে ম্যানিলা চৌধুরী, আবু তাহের ও খালেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১৭ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। ম্যানিলা ইয়াবা ব্যবসার অপরাধে ১০ মাস জেল হাজতে ছিল। সে চট্টগ্রামসহ ঢাকা’র বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা সরবরাহ করতো। সে ইয়াবা সম্রাজ্ঞী নামে পরিচিত। গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, টেকনাফ ও মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে ইয়াবা বাংলাদেশে আসে। চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। জানে আলম ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ হতে টাকা সংগ্রহ করে থাকে এবং হুন্ডির মাধ্যমে টাকা নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। আসামি কুলসুম, খালেদ ও আসিফ ম্যানিলা চৌধুরী ও তাহেরের অন্যতম সহযোগী ও ইয়াবা সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। কুলসুম গাজীপুর এলাকার বিভিন্ন লোকের কাছে ইয়াবা সরবরাহ করে। ম্যানিলা চৌধুরী, তাহের ও জানে আলম জনৈক আবদুস শুক্কুর ওরফে শাকুর মাহমুদ ওরফে শাকু এর হয়ে কাজ করে। শাকু মিয়ানমার থেকে ইয়াবা কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে এবং সারাদেশে সরবরাহ করে। ওদিকে র‌্যাবণ্ড১ এর একটি আভিযানিক দল মাদক চোরাচালান চক্রের একজন বিদেশী নাগরিকসহ ৪ সদস্যকে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হচ্ছে নাইজেরিয়ান নাগরিক অনিকা গডসন বামালো (৩৪)। তার সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিক আবুল কাশেম (৫২), পায়েল বেগম (২৮) ও নীলিমা লাবণ্য (২৮) গ্রেপ্তার হয়েছে। র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্ততারকৃত দুই নারী দীর্ঘদিন ধরে এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে আসামী পায়েল বেগমের স্বামী একজন নাইজেরিয়ান। সে আগেই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। আবুল কাশেম পেশায় গাড়ি চালক। মাদক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ডিএইচএল রামপুরা শাখাতে হেরোইন এর একটি চালান কাপড়ের বাক্সের মাধ্যমে চীনে পাঠানো হবে। তাৎক্ষণিকভাবে র‌্যাবের পক্ষ হতে ডিএইচএল অফিসে ফোন করে উক্ত চালানটিকে চীনে প্রেরণের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়। পরবর্তীতে র‌্যাবের একটি দল ডিএইচএল-এর অফিসে গিয়ে উক্ত কাপড়ের বাক্সটি উদ্ধার করে এবং বাক্সের মধ্যে মোট ৪৩টি আন্ডারওয়ারের প্যাকেট পায়। প্রতিটি আন্ডারওয়ারের প্যাকেটের মধ্যেই হেরোইন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অনিকা গডসন বামালো এর উত্তরার ১০নং সেক্টরের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে আরও ৫৭টি অনুরূপ হেরোইন সম্বলিত আন্ডারওয়ারের প্যাকেট ও হেরোইন প্রস্তুত করার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামাদি পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে আরও পাওয়া যায় ৩,১০০ জাল ডলার। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই চক্রটি শুধু হেরোইন পাচারই নয় জাল ডলারের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। অনিকা গডসন বামালোকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি আরও জানান, তার এই চোরাচালান চক্রের সঙ্গে আরও বেশ কজন নাইজেরিয়ান নাগরিক জড়িত। আটককৃত আসামিদের নিকট হতে আনুমানিক ১ কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইন, ১৪৪ ক্যান বিয়ার, ২ বোতল বিদেশী মদ, ৩,১০০ জাল ডলার ও ১টি প্রাইভেটকারসহ হাতেনাতে আটক করা হয়।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ