নূন্যতম মজুরি আট হাজার টাকা করার দাবিতে আজও উত্তাল বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে পোশাক শ্রমিকরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।
সকালে আশুলিয়া জিরাবো এলাকায় শত শত শ্রমিক সড়কে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুর চালায়। ঠিক একই সময়ে ঢাকার প্রগতি সরণি ও কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে শিবু মার্কেট এলাকায় অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়।এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
বিক্ষোভে পুলিশ বাঁধা দিলে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ পিরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। এর ফলে এসব এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ওইসব এলাকার দোকানপাট, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।
এদিকে সড়ক অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।
গত কয়েকদিন ধরেই গার্মেন্ট শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। তারই ধারবাহিতকায় গতকাল সোমবার বিজিএমইএ নেতারা বৈঠক করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং বন্ধ কারখানাগুলে খুলে দেয়া হবে।
কিন্তু সকালে গাজীপুরে কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও বেশ কয়েকটি কারখানা মালিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখায়। এ সময় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কুড়িল বিশ্বরোড: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর দাবিতে মঙ্গলবার সকাল নয়টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক কুড়িল বিশ্বরোড সড়ক অবরোধ করেন। তাঁরা কুড়িল উড়ালসেতুর ওপরে ও নিচে অবরোধ তৈরি করে বিক্ষোভ করছেন।
জানা গেছে- ইউরো জোন, গাজী টাওয়ার, মোহাম্মদীয়া, ক্ল্যাসিক, কেনিয়া গার্মেন্টসের প্রায় চার হাজার শ্রমিক এই অবরোধে অংশ নিয়েছেন। অবরোধের কারণে বিমানবন্দর সড়কসহ সংশ্লিষ্ট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার লুত্ফুল কবীর জানান, আলোচনা করে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
আশুলিয়া (সাভার): পুলিশ, শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় আজ সকালে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আজ সকাল আটটার দিকে জিরাবো বিশমাইল সড়কের উভয় পাশে মাসকাট ও রেডিয়েনসসহ অন্তত ১০টি পোশাক কারাখানার শ্রমিকেরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে জড়ো হন। এরপর তাঁরা সর্বনিম্ন মজুরি আট হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিতে কারখানার ভেতরে না ঢুকে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
একপর্যায়ে শ্রমিকেরা অন্যান্য কারখানায় ইটপাটকেল ছোড়েন। সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ধাওয়া করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
শিল্প পুলিশ আশুলিয়া জোনের পরিদর্শক আবদুস সাত্তার বলেন, সকাল ১০টা থেকে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও শ্রমিকেরা বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়েছেন। ওই এলাকাসহ পুরো শিল্প এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কালিয়াকৈর (গাজীপুর): ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুত্ এলাকায় আজ সকাল সাড়ে আটটার দিকে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে না গিয়ে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন।
একপর্যায়ে তাঁরা ওই এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন। পুলিশ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পোশাকশ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় অন্তত ১০ জন আহত হন।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) : বেতন বাড়ানোর দাবিতে মির্জাপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে পোশাক শ্রমিকরা। এসময় তারা সড়ক অবরোধ করে।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ টাঙ্গাইলের গড়াই শিল্পাঞ্চলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। এতে শ্রমিক, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
প্রসঙ্গত, পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা ও জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে গাজীপুরের ভোগড়া চৌধুরী রাঢ়ি এলাকায় ভলমন্ট ফ্যাশন, ভোগড়া বাইপাস এলাকায় কলোসাস এপারেলস, ম্যান্ট্রাস্ট সোয়েটার, কলম্বিয়া ও নাওজোরের দিগন্ত সোয়েটার, তিনসড়ক এলাকার স্প্যারো এ্যাপারেলস কারখানা, কোনাবাড়ী এলাকার তুসুকা, ইন্টার লিঙ্ক, সানমুন, যমুনা কম্পোজিট, এম এম গার্মেন্টস ও ইন্টারস্টপসহ আশপাশের বিভিন্ন কারখানা এবং বোর্ডবাজার, সাইনবোর্ড, ভোগড়া, তেলিপাড়া, নলজানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করে।
এ ঘটনায় সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে নৌমন্ত্রীর সভাকক্ষে সরকার, গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও শ্রমিকদের সংগঠন সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিজিএমইর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খন্দকার এম এ মান্নান ফকির আজ মঙ্গলবার থেকে গাজীপুরসহ রাজধানীর আশপাশে বন্ধ হওয়া সব গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য মালিকদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। এসময় তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সব গার্মেন্টে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তিনি গার্মেন্ট শ্রমিকদের কোনো গুজবে কান না দেওয়ারও আহ্বান জানান।



