একজন অধিনায়ক কিভাবে একটি দলকে বদলে দিতে পারে সেটা বেশ ভাল ভাবেই দেখিয়ে দিলেন মাশরাফি। কিন্তু মাশরাফিতো আর চিরকাল খেলবেননা। সব সময়তো আর মাঠে এভাবে দলকে উজ্জিবীত করবেন না। কখনো নরম আবার কখনো গরম সুরে শাসন করতে পারবেননা দলের সতীর্থদের। তখন কি হবে দলের ? তার অবর্তমানে দলের অবস্থা কি আবার আগের মত হবে। আর কিভাবেই বা দল পরিচালিত হবে? এ রকম হাজারো প্রশ্ন সামনে এসে দাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে লজ্জাজনক পারফরম্যান্সের পর ওয়ানডে সিরিজে একেবারে বিপরীত মুখী পারফরম্যান্সের কারণে এমন প্রশ্ন এসে দাড়িয়েছে সামনে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে বাজে হারের পর স্বপ্নের মতো এক ওয়ানডে সিরিজ কাটিয়েছে টাইগারবাহিনী। প্রায় দুই বছর পর নিজেদের প্রিয় ফরম্যাট ওয়ানডেতে সিরিজ জয়ের স্বাদ পাওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে এখন কিছু প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে। ‘এ’ দলের আয়ারল্যান্ড সফর আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজকে সামনে রেখে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে দলকে। আর সে সাথে সামনে যে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে টাইগারদের জন্য তা কিভাবে উৎরাবে সে প্রশ্নও সামনে এসে দাড়িয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত ছিলেন তামিম ইকবাল। কিন্তু তার সাথে কে খেলবেন তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ এরই মধ্যে অনেককেই দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কেউই পারছেন না তামিমকে সঙ্গ দিতে। সবশেষ তামিমকে সঙ্গ দেওয়া এনামুল হক বিজয় তিন ম্যাচেই ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয় চলতি বছর ৭ ওয়ানডে ম্যাচে মাত্র ৮৮ রান করা এনামুল হক বিজয় স্পষ্টতই হতাশ করেছেন সমর্থকদের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে ম্যাচেই তাকে দলে রাখার সিদ্ধান্তের কোন প্রতিদানই দিতে পারেন নি আনামুল। তিন ইনিংসে তার রান সাকুল্যে মাত্র ৩৩। এর আগে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওপেনিংয়ে ইমরুল কায়েস, সৌম্য সরকার এবং লিটন দাসকেও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছেন। মোহাম্মদ মিথুনও একবার সুযোগ পেয়ে কাজে লাগাতে পারেন নি। আসন্ন টি–টোয়েন্টি সিরিজে পারফরম্যান্স দেখার পর নির্বাচকদের হয়তো সৌম্য সরকার কিংবা লিটন দাসের দিকেই ঝুঁকতে হবে আবার। কিন্তু তারা কি পারবে তাদের আস্থার প্রতিদান দিতে সে প্রশ্ন তোলাই থাকল।
তবে বাংলাদেশ দলে উদ্বোধনী জুটিতে যেমন ভাবনার বিষয় রয়েছে তেমনি আরো বড় ভাবনার বিষয় হয়ে আছে দলের ফিনিশিং। তীরে এসে তরী ডুবানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেনা টাইগাররা। এখন কে হবেন সে ফিনিশার সেটাও বড় একটা প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে দলের টপ অর্ডার ভাল করায় মিডল অর্ডার কিংবা লোয়ার অর্ডারের উপর তেমন চাপ পড়েনি। ফলে তাদের পরীক্ষাটাও নেওয়া হয়নি। কিন্তু মিডল অর্ডারে সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন আর মাহমুদুল্লাহকে নিয়ে ভাবতে হচ্ছে ফিনিশারের জন্য। তবে প্রথম দুজন একেবারেই ব্যর্থ হয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। গত ১৪ ইনিংসেই সাব্বিরের ব্যাট ফলপ্রসু হতে ব্যর্থ। আর মোসাদ্দেক এখনও স্লগ ওভারে কিভাবে ব্যাটিং করতে হয় তাই সামলে উঠতে পারেন নি। তাদের দুজনের উপর যথেষ্ট ভরসা না থাকাতেই শেষ ম্যাচে ৩৯তম ওভারে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নিজেই ব্যাট হাতে নেমে পড়েন। কিন্তু এ সমস্যাতো আর শেষ হচ্ছেনা। বিশ্লেষকদের মতে মোসাদ্দেককে হয়তো একধাপ আগে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে মাহমুদুল্লাহকে শেষ ৬–৮ ওভারে নামানো যেতে পারে। আর সাব্বিরকে এখন নিশ্চিতই বিশ্রামে পাঠানোর সময় হয়েছে। একের পর এক সুযোগ পাওয়ার পরও সেটাকে কাজে লাগাতে পারছেননা এই ব্যাটসম্যান। সে সাথে শৃংখল ভঙ্গের বিষয়টিতো রয়েছেই তার বিরুদ্ধে। সাব্বিরের জায়গায় তরুণ ব্যাটসম্যান আরিফুল হককে সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও এই তরুণ কতটা চাপ নিতে পারবে সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
স্লগ ওভারে ব্যাটিং নিয়ে দুশ্চিন্তা যেমন রয়েছে তেমনি আরো বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে স্লগ ওভারে বোলিং নিয়েও। গত তিন বছর ধরেই ওয়ানডেতে শেষ পাঁচ ওভারে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা ইকোনমি রেট মোস্তাফিজুর রহমানের । তার চেয়ে ভাল ইকোনমি রেট শুধুমাত্র আফগান লেগ স্পিনার রশিদ খানের রয়েছে । মোস্তাফিজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক বড় সম্পদ। কিন্তু এটাও সত্য বাংলাদেশ দল তার উপর একটু বেশিই নির্ভরশীল। কিন্তু আরেকজন কাউকে পাওয়া যাচ্ছেনা যিনি কিনা শেষ দিকের ওভার গুলোতে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের রাশ টেনে ধরতে পারেন। রুবেল হোসেন স্বপ্ন ভঙ্গ করেছেন অনেকবার। তাই তার উপর ভরসা রাখাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেই দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে ফর্ম হারিয়ে ফেলা পেসার তাসকিন আহমেদের অভাব বোধ করছে বাংলাদেশ দল। স্লগ ওভারে একসময় দারুণ সফল বোলার ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন দলে নেই। আবার কবে দলে ফিরতে পারবেন তারও কোন নিশ্চিয়তা নেই। যদিও দলে সাকিব আছেন। যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে বল করতে পারেন। কিন্তু অন্য প্রান্তেতো বল করতে হবে কাউকে না কাউকে। কিন্তু কে আছে সে দায়িত্ব নেওয়ার।
দেশে কিংবা দেশের বাইরে। বাংলাদেশ নিজেদের বোলিং শক্তি তৈরি করে স্পিন দিয়ে। কিন্তু শুরুর দিকের ওভার গুলোতে একজন পেসারের সাথে কোন স্পিনার বল করবে সেটাও ভাবতে হয়। যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বেশ সফল বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্টিত করেছেন স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। পেসের হেরফের আর লেন্থে পরিবর্তন এনে উইকেট টু উইকেট বলে করে ব্যাটসম্যানদের বেশ ভোগাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। গত এশিয়া কাপ এবং ঘরের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ থেকেই এই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তিনি। কিন্তু আগামী ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফরে পেস–বান্দব পিচে তিনি কিভাবে কার্যকর হবেন তা এখনই ভাবতে হবে। কারণ নতুন বলের বোলার বলতে এখন বাংলাদেশের ভান্ডারে মাশরাফি আর মিরাজই আছেন। মোস্তাফিজকে চাপের মুহূর্তে বিশেষ করে শেষ ১০ ওভারে ব্যবহার করছেন মাশরাফি। ফলে নতুন বলে পেস বোলার সঙ্কট আসন্ন। সেক্ষেত্রে রুবেল, তাসকিন কিংবা শফিউলকে সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। কিন্তু আস্থা রাখার জায়গাটা কোথায়। এভাবে হিসেব করলে অনেক জায়গায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দলে। যেটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পর বলেছেন অধিনায়ক মাশরাফি। এখন সে সব ঘাটতি পূরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে চ্যালেঞ্জ এসে দাড়িয়েছে তা কতটা মোকাবেলা করতে পারবে সেটা প্রশ্ন হয়ে তোলা থাকল ভবিষ্যতের জন্য।
পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন বড় হয়ে দাড়িয়েছে দলের পাঁচ অভিজ্ঞ এবং সেরা তারকার পর দলের হাল ধরবেন কারা। কারন এদের পর আর কাউকে দেখা যাচ্ছেনা যারা এই শূণ্যস্থান পুরণ করতে পারে। আগামী ১০ মাসে প্রচুর ক্রিকেট অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ দলের জন্য। তারপর আবার ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ তো আছেই। এই সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু বিষয় গুছিয়ে আনতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটে ভাল পেস বোলিং আক্রমণ, ওয়ানডের ওপেনিং ব্যাটসম্যান সমস্যা, এবং কমপক্ষে দুজন আক্রমণাত্মক মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। কিন্তু তরুণ ক্রিকেটাররা পারছেননা নিজেদের ঠিকভাবে মেলে ধরতে। তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে মিজানুর রহমান, সাইফ হাসান, আল আমিন এবং আফিফ হোসেন আছেন যারা ‘এ’ দলের হয়ে খেলছেন। তাদের ভেতর অনেকেই বিকল্প দেখছেন। অন্যদিকে তাসকিন, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আর শরিফুলের বোলারদের সামনে টেস্ট কিংবা টি–টোয়েন্টিতে সুযোগ দেওয়া হবে। বাংলাদেশের রিজার্ভ বেঞ্চ বলতে মোটামুটি এমনই। এখন এদের প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে সিনিয়রদের উপর থেকে বোঝা কমানোর এখনই সময়। নয়তো সিনিয়ররা বিদায় নিলে দলের জন্য তা অশনি সংকেত হিসেবে ধরা দিতে পারে।




