বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, একে তো নাচুনি বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি ! প্রবাদটার সখ্যতা শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখের মঙ্গল যাত্রাতেই যেনো সুষ্পষ্টভাবে মেলে! উৎসব প্রিয় বাঙালিরর সঙ্গে যদি ঢাকের তাল যোগ হয়, তবে যেনো উদযাপনে নতুন মাত্রা পায়। আর তা দেখে এতে যোগ দিতে বাধ্য হন অবাঙালিরাও। তাইতো বাংলা-বাঙালির হিসেব ভুলে, নগর-গ্রাম আর ধনী-গরিবের বৈষম্য কাটিয়ে সবাই মেতে ওঠে সার্বজনীন বর্ষ বরণের উৎসবে। বাঙালির বর্ষবরণের আয়োজন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মঙ্গলযজ্ঞে।
শনিবার, ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ এর প্রথম দিন। পহেলা বৈশাখে বরাবরের মতোই এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে মঙ্গল শোভাযাত্রার। সকাল সোয়া ৯টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে হাজারো মানুষ অংশ নেয়। শোভাযাত্রার পুরোটা সময়জুড়ে তারা গেয়েছেন নতুন বছরে যেন মঙ্গলে কাটে, তার গান। বাংলার চিরায়ত সাজে নববর্ষ বরণ করতে সকালে ঢাবির চারুকলা অনুষদের প্রধান গেট থেকে শুরু হয় মঙ্গল যাত্রা। উজ্জীবিত সূর্যের আহ্বানে এবার ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’র গান গেয়েছেন সবাই।
হৃদয়ে স্পর্শ নিয়েছেন শান্তির প্রতীক পায়রার কোমল লোমের। এছাড়া বড় টেপা পুতুল, দু’হাতে পায়রা উড়িয়ে দেওয়া, গ্রামের পুকুরে মহিষের গোসল, বিলের ধারের মাছ আর বকের লুকোচুরিসহ নানান গ্রামীণ আবহে সাজানো হয় এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন।
এগুলো তৈরি হয়েছে প্রান্তিক এলাকার কুমারদের লোকজ আবহকে কেন্দ্র করে। এগুলো বাঁশ, কাঠ ও বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে তৈরি। শোভাযাত্রার মাঝখানে অনেকগুলো তরুণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঢাকের তালে ঘুরে ঘুরে গাইছিলেন বৈশাখের বন্দনা ‘রঙে ভরা বৈশাখ আমার এলো রে’।
বাঙালির উদযাপনে শামিল হয়েছেন স্পেনের নিকোলাস ব্রাউন। ছোট্ট শিশু ত্বনী হাতে রূপসী বাংলার পতাকা নিয়ে, মাথায় গামছা বেঁধে আর গালে আলপনা এঁকে বাবার সঙ্গে ঘুরতে থাকে হাত ধরে।
প্রবীণ নোমান রহমান তরুণদের উজ্জীবিত করতে তাল দিয়েছেন ঢোলের বাদ্যে। সদ্য বিবাহিত রাজীব আর সুমনা হলুদ সাদা রঙে ফুল হাতে খুঁজে নিয়েছেন আনন্দের যোগান। আর সদ্য কৈশোর পার করা তরুণ তরুণীরা নাচ-গান, অভিবাদন, হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ হাসিতে জমিয়ে রাখেন পুরো মঙ্গল শোভাযাত্রা। তাদের সবার কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে প্রায় একই কথা- নতুন বছরটা ভালো কাটুক।
নিকোলাস ব্রাউন বলেন, আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি, সম্প্রতি ভারতেও ছিলাম কিছুদিন। তবে বর্ষ বরণের এতো বড় আয়োজন আর কোথাও দেখিনি। বিশেষ করে নিজেদের সংস্কৃতি এভাবে তুলে ধরে মঙ্গল কামনার শোভাযাত্রা আমার মনে হয় পৃথিবীতে বিরল। এ বিপুল আনন্দযজ্ঞের সঙ্গে শুধু বাঙালি হলেই সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাসান নিটল জানান, এ আয়োজনে আমরা মঙ্গল কামনা করি। বছরের বাকি সময়টা যেনো আমরা ভালোভাবে পার করতে পারি এবং বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে, এ তারই আয়োজন। একান্ত নিজেদের উৎসব। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে এ দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। হাজারো মানুষ বিভিন্ন রঙে সেজে অংশ নিয়েছেন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এ শোভাযাত্রায়।




