চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা হতে পারে যে কোনো সময়। কিন্তু কমিটিতে যাদের স্থান পাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে তারা কেউ নিয়মিত ছাত্র নয়। ফলে তাদের নিয়ে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষিত হলে ছাত্রদলের মতো ছাত্রলীগেও দেখা দিতে পারে অসন্তোষ। তাই রাজনীতিতে সক্রিয় নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে কমিটি ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেক নেতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা আসতে পারে যে কোনো দিন। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। দক্ষিণ জেলা কমিটি নিয়ে সিদ্ধান্তের পর কেন্দ্রীয় নেতারা নগর কমিটি নিয়ে ভাবছেন। কেন্দ্রীয় নেতারা নগর আওয়ামী লীগের বিবদমান গ্রুপের অনুসারীদের নিয়ে ‘ব্যালেন্স করে’ এ কমিটি ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।
ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ গত ১৯ আগস্ট সাংগঠনিক কাজে চট্টগ্রাম সফরে আসেন। মূলত প্রধানমন্ত্রীর রামু সফর ও ফটিকছড়িতে জনসভা উপলক্ষে তিনি কঙবাজার, রামু, ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম সফর করেন। তখন তিনি নগর ছাত্রলীগ সভাপতি এম আর আজিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. সালাউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের উপস্থিতিতে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কমিটি নিয়ে পরামর্শ করেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি ঘোষণা করবো খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এ সংক্রান্ত কাজ ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছি।
নিয়মিত ছাত্র নয় এবং ‘আদু ভাইদের’ নিয়ে কমিটি গঠনের গুঞ্জন সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্রে যা আছে তাই হবে। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হবে।
চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে সম্ভবত বিভিন্ন সভা সমাবেশ নিয়ে ব্যস্ততার কারণে আগস্ট মাসে কমিটি ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি ঘোষণার কথা বেশি আলোচিত হচ্ছে তারা হলেন-এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি আজিজুর রহমান, এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ একাংশের সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াছ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ সুমন, ডা. আফসারুল আমীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা রাজিব হাসান রাজন ও মো. ইমতিয়াজ বাবলা এবং আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ইয়াসিন আরাফাত ও রেজাউল আলম রনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ প্রথমে নগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হবে নগর আওয়ামী লীগের বিবদমান তিন ধারার অনুসারী ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে। আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান দেয়া হবে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমীন এবং আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিয়মিত একাধিক ছাত্রনেতার অভিযোগ, ‘যাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি ঘোষণার কথা ইতোমধ্যে শোনা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশেরই বয়স ৩০ অতিক্রম করেছে এবং নিয়মিত ছাত্র নয়। ফলে এ নিয়ে সংগঠনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। ত্যাগী পরীক্ষিত ও নিয়মিত ছাত্রদের মধ্যে দেখা দিতে পারে অসন্তোষ।’
অপর এক সূত্রের দাবি, নগর আওয়ামী লীগের নেতারা নিয়মিত ছাত্র নয় এবং বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়াদের তালিকা দিয়ে কমিটি ঘোষণার চেষ্টা করলেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কিছু নেতা এর বিরোধিতা করছেন। তাদের মতে, অছাত্র নিয়ে কমিটি ঘোষণা করলে নগর ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে যেভাবে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে ছাত্রলীগের ক্ষেত্রেও তাই হতে পারে। তাছাড়া গঠনতন্ত্রের শর্তও ভঙ্গ হবে। তাই নিয়মিত ছাত্র এবং যাদের বয়স ৩০ বছরের মধ্যে তাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এখন নিয়মিত ছাত্র ও যাদের বয়স রয়েছে এমন নেতাদের বায়োডাটা সংগ্রহ করছেন।
জানতে চাইলে সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি আবু তাহের সুপ্রভাত বলেন, নিয়ম হচ্ছে নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে ছাত্র সংগঠনের কমিটি গঠন করা। কিন্তু নগর ছাত্রলীগের কমিটি দীর্ঘদিন থেকে না হওয়ায় নগর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন জটিল হয়ে পড়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি তারা নগর কমিটি নিয়ে সভানেত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। সভানেত্রীর নির্দেশ হলো-২৯ বছরের বেশি বয়সের যেই হোক তাকে কমিটিতে না রাখতে।
প্রসঙ্গত, নগর ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয় ২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। এ সময় এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম আর আজিমকে সভাপতি ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা মো. সালাউদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে ১০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ওই সময় মানা হয়নি দলীয় গঠনতন্ত্র। কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। নিয়ম বহির্ভূতভাবে কমিটি ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার আগ্রহে। ওই সময়ে কমিটি ঘোষণার পর পরই নগর ছাত্রলীগের একটি অংশ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে নানা অভিযোগ তুলে। তখন অভিযোগ করা হয়েছিল অছাত্র ও বিবাহিতদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। ত্যাগী, পরীক্ষিত ও প্রকৃত ছাত্ররা বঞ্চিত হয়েছেন। এ কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদে সেদিন কমিটিতে স্থান পাওয়া ১২ জন নেতা একযোগে কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। সেই থেকেই চলছে ওই কমিটির কার্যক্রম।
এদিকে কমিটির মেয়াদ প্রায় ১০ বছর হতে চলেছে। এ নিয়ে নগর ছাত্রলীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ। এরই পরিপেক্ষিতে একাধিকবার কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও মাঝপথে থেমে যায় নানা কারণে। এর মধ্যে নগর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই প্রধান। অন্যদিকে বর্তমান নগর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তারা কয়েক বছর আগে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে একটি কমিটিও জমা দিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি। তবে সম্প্রতিক সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় কমিটি। ফলে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ বিভিন্ন জেলা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর ছাত্রীগ সভাপতি এম আর আজিম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য, সংগঠনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, ত্যাগী ও যোগ্যদের নিয়ে কমিটি গঠনের ব্যাপারে। যারা দলের দুঃসময়ে পাশে থাকবে, সংগঠন পরিচালনার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখে তাদের কমিটিতে স্থান করে দিতে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে নিয়মিত ছাত্রনেতাদের। তাদের কর্মকাণ্ডই নিশ্চিত করবে কারা কমিটিতে থাকবে আর থাকবে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটি গঠনের ব্যাপারে বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলছে। তবে এসব কথা সত্য নয়। কমিটি গঠন করা হবে নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে। এ ক্ষেত্রে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের শর্ত অনুসরণ করা হবে।




