চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
অবৈধ বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগর এলাকা। সিটি করপোরেশনের অনুমতি না নিয়েই পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের মালিকানাধীন জায়গায় শত শত বিলবোর্ড বসিয়ে ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও যুবদল-ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন বিলবোর্ডের এই ব্যবসা। নগরের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় জানমালের নিরাপত্তার জন্যও এসব বিলবোর্ড হুমকি বলে মনে করা হচ্ছে।সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে এখন সব মিলিয়ে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা আট শতাধিক। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের জায়গায় আছে কয়েক শ বিলবোর্ড। এগুলো স্থাপনের জন্য সিটি করপোরেশনের অনুমতি নেওয়া হয়নি। ছয় শতাধিক অবৈধ বিলবোর্ড সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে সিটি করপোরেশন।সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট নাজিয়া শিরিন প্রথম আলোকে জানান, নগর এলাকায় যে কারও মালিকানাধীন জায়গায় বিলবোর্ড স্থাপন করতে হলে সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের অনুমতি নেয়নি। তাহলে এসব অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ করা হচ্ছে না কেন, এমন প্রশ্নে নাজিয়া শিরিন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের জায়গায় অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ করার ক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছয় শতাধিক বিলবোর্ডে হাত দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। সেগুলো সরিয়ে নিতে আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।’সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরে সিটি করপোরেশন অনুমোদিত বিলবোর্ডের সংখ্যা আট হাজার ৪৫১টি। এসব বিলবোর্ড ভাড়া দিয়ে বছরে আয় হয় মাত্র সোয়া দুই কোটি টাকা। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের ২২২টিসহ ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক অবৈধ বিলবোর্ড নগরে ঝুলছে। এগুলো ঢেকে দিয়েছে নগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ঘূর্ণিঝড় কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এগুলো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের পাঠানটুলী, ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড, অলি খা থেকে মুরাদপুর হয়ে অক্সিজেন, বহদ্দারহাট থেকে কালুরঘাট, অক্সিজেন থেকে কুয়াইশ এবং বহদ্দারহাট থেকে গণি বেকারি পর্যন্ত ছয়টি সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সিটি করপোরেশনের কাছে রাস্তা বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই এই ছয়টি সড়কে শতাধিক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘সিডিএ বিলবোর্ডের ব্যবসা করে না। অথচ আমরা রাস্তা চওড়া করার আগেই রাতের অন্ধকারে কে বা কারা বিলবোর্ড স্থাপন করেছে। সিটি করপোরেশন সেগুলো না সরালে নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরাই সরিয়ে নেব।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা কাউকে বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দিইনি। নগরের দুটি প্রবেশপথই আমাদের জায়গায় মধ্যে পড়েছে। সেখানে বড় বড় বিলবোর্ড বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনই এসব বিলবোর্ড স্থাপন করেছে বলে আমরা শুনেছি। এসব উচ্ছেদ তো সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। এ জন্য আমরাও তাদের পাল্টা চিঠি দিয়েছি।’
চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত বন্দরের জায়গায় কয়েক শ বিলবোর্ড রয়েছে। এর মধ্যে অনেক অবৈধ বিলবোর্ডও রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা এগুলো ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছেন বলে সিটি করপোরেশনের অভিযোগ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বারিক বিল্ডিং থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি বিলবোর্ডের জায়গা ভাড়া দিয়েছে বন্দর। বন্দরের জায়গায় অবৈধ বিলবোর্ড নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আছে রেলের জায়গা। ওই সব জায়গায় শত শত বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. তাফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বিলবোর্ড নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য আমরা অপেক্ষা করছি, যে কারণে নতুন করে কাউকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। আবার পুরোনোগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না।’
ভাগাভাগির ব্যবসা: যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও যুবদল-ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাই চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণ করছেন বিলবোর্ডের ব্যবসা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন, যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সনৎ বড়ুয়া ও ওয়াসিম উদ্দিন রয়েছেন। যুবদলের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন ও ছাত্রদলের শাহেদ আকবরও সিটি করপোরেশন থেকে অনেক বিলবোর্ড ইজারা নেন। অভিযোগ আছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গায় অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপনের সঙ্গে এসব নেতা জাড়িত।
যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে বৈধভাবে বিলবোর্ড ব্যবসা করছি। অবৈধ বিলবোর্ড ব্যবসা আমি নিয়ন্ত্রণ করি না।’ নগর ছাত্রদলের সভাপতি গাজী মো. সিরাজউল্লাহও অবৈধ বিলবোর্ড ব্যবসার সঙ্গে ছাত্রদল-যুবদলের নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।




