ষ্টাফরিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
রীতিমতো অবিশ্বাস্য। কল্পনাতীত। বিশেষ করে কোনো মা-বাবার পক্ষে তো মেনে নেওয়া আরও কঠিন। তবুও ভয়ঙ্কর ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো উপায়ও নেই। কারণ পুলিশের হাতে পৌঁছে গেছে তথ্যপ্রমাণ। আর তা হল বুকের আদরের মানিক ‘ও’ লেভেলপড়ুয়া ঐশীই খুন করেছে তার জন্মদাতা মা-বাবাকে। পুলিশ বলেছে, ঐশী এতটাই পাষাণী যে মা-বাবাকে খুন করার পরও তার চোখে পানি আসেনি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, বখাটে ছেলে সন্তানের হাতে জন্মদাতা খুনের ঘটনা নতুন নয়। তবে কোমলমতি মেয়ের হাতে মা-বাবা খুনের এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি। তারা বলেছেন, নষ্ট জগত্ থেকে মেয়েকে ফেরাতে গিয়ে এমন পরিণতির কথা কল্পনাও করা যায় না। মা-বাবার অভিযুক্ত এই ঘাতক পেশাদার কিলারকেও হার মানিয়েছে। তার দেওয়া স্বীকারোক্তির পর সাধারণ মানুষ তো বটেই, পুলিশের অনেক কর্মকর্তাও বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। অভিভাবক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। ঘরে ঘরে গতকালের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বিপথগামী কন্যা সন্তানের হাতে পুলিশ পরিদর্শক দম্পতি খুনের এই ঘটনা। লোমহর্ষক এ ঘটনার বিবরণ শুনে সবাই বলেছেন, আমরা কোন যুগে বসবাস করছি!
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ‘ও’ লেভেলপড়ুয়া মেয়ের উচ্ছৃঙ্খলতায় বাধা দেওয়ার কারণেই খুন হন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। হত্যাকাণ্ডের আগে ঘাতক মেয়ে ঐশী তার বাবা-মাকে কৌশলে কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। এরপর বাবা-মা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লে আগে মায়ের বুকে ছুরি বসায় সন্তান নামের কলঙ্ক ঐশী। মায়ের শরীর ছিন্নভিন্ন করার পর জন্মদাতা বাবাকে নির্মমভাবে জবাই করে সে। পরে সমবয়সী গৃহকর্মী সুমির সহযোগিতায় বাবা-মায়ের লাশ টেনে নিয়ে রাখে বাথরুমে। সকালে মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ নিয়ে ছোট ভাই ঐহি ও গৃহকর্মীসহ বাসা থেকে বেরিয়ে যায় সে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ঐশী, তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু রনি ওরফে জনি, গৃহকর্মী সুমি, বান্ধবী তৃষাসহ ছয়জনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। অবশ্য গতকাল দুপুরে ঐশী নিজেই পল্টন থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেয়। পরে তাকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘণ্টাখানেক জিজ্ঞাসাবাদের পর ঐশীকে নিয়ে সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালানো হয়। এর আগেই নিহত দম্পতির বাসার দুই দারোয়ান শাহীন ও মোতালেব এবং ম্যানেজার আমজাদসহ আরও কয়েকজনকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গতকাল রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে স্মরণকালের বেদনার সব তথ্য। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম জানান, এসবি পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ঐশীর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
মনিরুল ইসলাম জানান, ঐশী ও তার সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানতে পেরেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগে ঐশী তার মা-বাবাকে কফির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ায়। তবে আটকের পর প্রথমে ঐশী একেক সময় একেক রকম তথ্য দিচ্ছিল। এমনকি সে কান্নার চেষ্টা করলেও তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়নি। পরে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ঐশী উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করত। এক পর্যায়ে সে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে মা-বাবা ঐশীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছিলেন। মাঝেমধ্যেই গালমন্দ করতেন। গত ঈদের আগে একদিন রাত ১২টায় ঐশী বাসায় ফেরায় বাবা তাকে মারধর করেন। এরপর থেকে ঐশীর বাইরে বেড়ানো বন্ধ করে দেন মা-বাবা। এ থেকেই মা-বাবার প্রতি ক্ষুব্ধ হয় ঐশী। পরিকল্পনা করে সে মা-বাবাকে হত্যা করার। তার এই হত্যাকাণ্ডে প্রথম থেকেই সহযোগিতা করে গৃহকর্মী সুমি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী গত বুধবার ঐশী অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ করে। সন্ধ্যায় ঐশী কৌশলে তার মায়ের কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। পরে রাত ১১টার দিকে কর্মস্থল থেকে বাবা মাহফুজুর রহমান বাসায় ফেরেন। এ সময় তিনি স্ত্রীকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে নিজে রাতের খাবার খান। পরে ঐশী তার বাবাকে কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খেতে দেয়। এতে দু’কক্ষে দু’জন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাসায় থাকা ধারাল ছুরি দিয়ে ঐশী প্রথমে তার মায়ের বুকে ও পাঁজরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরে অন্য রুমে গিয়ে বাবাকে জবাই করে। এ সময় তার একমাত্র ছোট ভাই ঐহিকে বাবার রুমের বাথরুমে আটকে রাখা হয়। পরে গৃহকর্মী সুমিসহ মা-বাবার লাশ টেনে নিজের কক্ষের বাথরুমে রেখে দেয় ঐশী।
গৃহকর্মী সুমির দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, লাশ টেনে নেওয়ার সময় সুমি পা ধরেছে। আর ঐশী হাত ধরে টেনে নিয়েছে। এরপর তারা দু’জন মিলে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে। পরে ছোট ভাই ঐহিকে মা-বাবা ঝগড়া করেছে বলে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। সকালে ঐহি ও সুমিকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সকালে ঐশী নিচে গিয়ে একটি সিএনজি ভাড়া করে আনে। পরে দুটি ব্যাগে আলমারি থেকে প্রয়োজনীয় কাপড়, মায়ের স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা নিয়ে বেরিয়ে যায়। ওই সিএনজিতে তারা তিনজন সারাদিন উদ্দেশ্যবিহীন ঘোরাঘুরি করে। দুপুরে ধানমণ্ডির একটি রেস্টুরেন্টে তারা খাবারও খায়। পরে সন্ধ্যায় ঐশী সিএনজি চালককে তার সঙ্গে থাকা গৃহকর্মী সুমিকে বাসায় রেখে আসতে বলে। বিনিময়ে সে সিএনজি চালককে ১৫ হাজার টাকা দেয়। সুমিকে সিএনজি চালকের বাসায় রেখে ঐশী ছোট ভাইকে নিয়ে কাকরাইলে বান্ধবী তৃষার বাসায় যায়। সেখান থেকেই মধ্যরাতে সে খালুর কাছে ফোন করে মা-বাবার ঝগড়া ও রাগ করে রাজশাহী যাওয়ার মিথ্যা গল্প বলে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, প্রযুক্তির সহযোগিতায় পুলিশ ঐশীর ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু রনি ওরফে জনিকে আটক করে। হত্যাকাণ্ডের পর মূলত বখাটে এই যুবকের সহায়তায় ঐশী বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে ছিল। হত্যাকাণ্ডে জনি ওরফে রনিসহ অন্যদের সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে গতকাল দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গ্রামের বাড়ি মরাগাঙ্গকান্দায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, নিহত স্বপ্না রহমানের শরীরে ১১টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। সবগুলো ছুরিকাঘাতই কোমড় থেকে ওপরের অংশে ছিল। এছাড়া নিহত মাহফুজুর রহমানের শরীরে দুটি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। গলায় জবাইয়ের চিহ্ন ছিল। ছুরিকাঘাতের ধরন দেখে তিনি অপেশাদার খুনির হাতে মাহফুজ-স্বপ্না দম্পতির মৃত্যু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে বিকেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন জামে মসজিদের সামনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সহকর্মী ও উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার জানাজায় অংশ নেন। এর আগে গতকাল দুপুরে নিহত মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান রুবেল বাদী হয়ে রাজধানীর পল্টন থানায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ২ নম্বর চামেলীবাগের চামেলী ম্যানসন অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচতলায় ৫/বি ফ্ল্যাটের একটি কক্ষের বাথরুম থেকে এসবির পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে নিহত দম্পতির বড় মেয়ে ঐশী রহমান ও গৃহকর্মী সুমি নিখোঁজ ছিল। এ সময় পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরাও হত্যাকাণ্ডে মেয়ে ঐশীর হাত রয়েছে বলে সন্দেহ পোষণ করেন। পলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি বড়ই স্পর্শকাতর হওয়ায় আইনের সবগুলো দিক খতিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আজ ঐশী ও তার সহযোগীদের আদালতে হাজির করা হবে।




