মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়সৈয়দ শামসুল হক আর নেই

সৈয়দ শামসুল হক আর নেই

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮১ বছর। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার বিকালে চিকিৎসকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে সদর্প বিচরণকারী সৈয়দ হকের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

সৈয়দ হকের মৃত্যুর খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় সৈয়দ হকের শোকে মুহ্যমান রাজনীতিকরাও। এদিকে তার মৃত্যুতে আজ বিকালে শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠেয় আনন্দ আয়োজনটি স্থগিত করে শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন উদযাপন কমিটি। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারজয়ী এই লেখকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। এছাড়া স্পিকার, মন্ত্রীবর্গ ও বিশিষ্টজনেরাও শোক প্রকাশ করেন।

ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে চিকিৎসার জন্য গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য গেলে সৈয়দ হকের ক্যান্সার ধরা পড়ে। লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে কিছু দিন চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিলে জীবনের বাকি দিনগুলো দেশে কাটানোর জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর ফিরে আসেন তিনি। ফেরার পর থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে তাকে দেখে এসে তার চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

হাসপাতালে সোমবার দুপুরে সৈয়দ হকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ভোর থেকে কৃত্রিম উপায়ে তাকে শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল। দুপুরে তাকে দেখে এসে কবি মুহাম্মদ সামাদ সাংবাদিকদের বলেন, সঙ্কটাপন্ন হলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না। তার কয়েক ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, এই লেখক আর বেঁচে নেই।

ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে মরদেহ গুলশানের বাসায় নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সেখানে একটি জানাজা হবে। এরপর মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় নেওয়া হবে বাংলা একাডেমিতে। সেখানে শ্রদ্ধা জানানোর পর ১১টায় মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। দুপুরে জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজার পর কুড়িগ্রামে নেয়া হবে। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে তার কবর হবে।

গত বছর নভেম্বরে কলেজ চত্বরে আয়োজিত এক গুণীজন সংবর্ধনা ও সাহিত্যকথন অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হক তার এই শেষ ইচ্ছার কথা জানান। কলেজ কর্তৃপক্ষ সে সময়ই সরকারের অনুমোদন নিয়ে লেখকের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্রসহ সাহিত্যের সব শাখায় স্বচ্ছন্দ সৈয়দ হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও গৃহিণী হালিমা খাতুনের ঘরে। ১৯৫৩ সালে ‘একদা এক রাজ্যে’ কাব্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু হলেও ‘তাস’ নামক গ্রন্থ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। আর ১৯৮৪ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করেছিল সরকার।

তারপর সাহিত্যের সব শাখায় অবিরাম লিখেছেন সৈয়দ হক। তবে সব ছাপিয়ে কবি পরিচয়টিই প্রধান মনে করতেন তার সাহিত্যাঙ্গনের বন্ধুরা। বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা, পরাণের গহীন ভেতর, নাভিমূলে ভস্মাধার, আমার শহর ঢাকা, বেজান শহরের জন্য কেরাম, বৃষ্টি ও জলের কবিতাণ্ডএসব কাব্যগ্রন্থের অজস্র কবিতায় তার নানা নিরীক্ষা জনপ্রিয়তাও এনে দেয় তাকে।

কাব্যনাট্য রচনায় ঈর্ষণীয় সফলতা পাওয়া সৈয়দ হক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘গণনায়ক’, ‘ঈর্ষা’ ইত্যাদি নাটকে রেখেছেন মুন্সীয়ানার স্বাক্ষর। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি মহাকাব্যিক পটভূমিকায় ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ নামে দীর্ঘ উপন্যাস যেমন লিখেছেন, তেমনি ছোট আকারের উপন্যাস লিখেছেন সমান তালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে তার ‘নিষিদ্ধ লোবান’সহ নানা উপন্যাসে।

‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নীল দংশন’, ‘মৃগয়া’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘এক মহিলার ছবি’, ‘দেয়ালের দেশ’, ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘মহাশূন্যে পরানমাস্টার’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’, ‘শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ’, ‘বাস্তবতার দাঁত ও করাত’, ‘আয়না বিবির পালা’সহ ৫০টির বেশি উপন্যাস এসেছে তার হাত দিয়ে। ছোটগল্পে তিনি নিজের এলাকা উত্তরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের জীবনের মর্মন্তুদ ছবি এঁকেছেন।

গত শতকের ষাট, সত্তর ও আশির দশকে অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন্য গানও লিখেছেন সৈয়দ হক। তার লেখা গান ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’র মতো বহু গান এখন মানুষের মুখে ফেরে।

তার নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস নিয়ে কয়েক বছর আগে ‘গেরিলা’ নামে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। সংবাদপত্রে কলাম লেখাকে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে অনেকেই সৈয়দ হকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘হৃৎকলমের টানে’র কথা বলেন। তার আত্মজীবনী ‘প্রণীত জীবন’ও প্রশংসিত সাহিত্যাঙ্গনের মানুষদের কাছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ