সবাইকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ আহ্বান করে দেশকে কঠিন অবস্থা থেকে উদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তিনি বলেন, সুশাসন আজ কেবল প্রশ্নবিদ্ধ নয়। সুশাসন আজ গুলিবিদ্ধ। তাই আসুন, দেশের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য সবাই মিলে ঐক্যমত গড়ে তুলি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে অনুরোধ করব, যে সমস্ত রাজনৈতিক দল সন্ত্রাসীতে বিশ্বাস করে না। জ্বালাও পোড়াও রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, তাদের সবাইকে নিয়ে জাতীয় সংলাপে আলোচনা করুন। কঠিন সংকট থেকে দেশকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের একাদশতম অধিবেশনে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এ সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ বলেন, আমাদের সমস্যার কোন অন্ত নাই। সম্ভাবনার পথ দেখছি না। তারপরও বিবেকের তাড়নায় অনেক কথা বলতে হচ্ছে। এটা বলতে হচ্ছে দায়িত্বের কারণে। কারণ আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আমরা কেউ নিরাপদে নেই। আজ বিবেকের তাড়নায় অনেক কথা বলতে হচ্ছে। লোকজন কি নিরাপদে কর্মস্থালে আসতে পারে। মা কি তার সস্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে পারেন? হিন্দু পুরোহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেউ কি নিরাপদ বোধ করছে? আমরা কেউ নিরাপদে নেই। অনেকের ছেলে যখন বড় হয় তখন সন্ধ্যার পর বাড়িতে সংঙ্কিত হয়ে পরেন ছেলে বাড়ি ফিরবে কি না। এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না।
সাবেক এই রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, সেদিন পত্রিকায় দেখলাম তনুর মা প্রশ্ন করেছেন গরীব বলে কি আমরা বিচার পাব না। তিনি বলেন, সাগর-রুনির হত্যার কি বিচার হয়েছে। তাহলে তারা কি বিচার পাবে না। একটি গুপ্ত হত্যার কি বিচার হয়েছে? এমন নজির আপনি দেখাতে পারবেন?
তিনি বলেন, যে সমাজে একজন এসপি’র স্ত্রী নিরাপদ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হতে পারে? গুপ্তহত্যার পরিসংখ্যাণ তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, গত মার্চ হতে এ পর্যন্ত ১৩ জন গুপ্ত হত্যা শিকার হয়েছে। এদায়িত্ব কি সরকারের নিতে হবে না? অন্যদিকে ২০০৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বন্দুক যুদ্ধে ১ হাজার ৭১৫ জন নিহত হয়েছে। এসব কি সুশাসনের ইঙ্গিত বহন করে? আমি সেদিন বলেছিলেম এসব সন্তানহারা মায়ের চোখের পানিতে আমরা ভেসে যাব।
বিএনপি’র দিকে ইঙ্গিত করে এরশাদ বলেন, ক্রসফায়ার চালু করেছিলো বিএনপি। ২০০৪ সালে প্রথম ক্রসফায়ার চালু করা হয়, কেনো করেছিলো? কারণ এদেশে আইনের শাসন ছিলো না, আইনের শাসন ছিলো না বলেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। সেদিন ২০০৪ সালে ২১ আগষ্ট প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, যাদের বিচার এখনো হয় নাই। সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমরা এখনো বহন করে চলছি।
এরশাদ আরও বলেন, আমাদের প্রধান বিচারপতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এদেশে বিনিয়োগ হবে না। যখন দেশের প্রধান বিচারপতি আইনের শাসন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন তখন সাধারণ মানুষের আইনের পাওয়ার উপায় থাকে না। মানুষ চোখে অন্ধকার দেখে। সরকারের সমস্ত উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রতিনিয়ত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সুশাসন উন্নয়ন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন সুবাতাস জনগণ পায় না। অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে দুই একটি কথা বলতে চাই উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, তিনি আমার সময়ে অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি হাসিতে হাসিতে আশি পার করেছেন এবং এই সংসদে ৯০ পৃষ্ঠার একটা বাজেট পেশ করেছেন সাবলীলভাবে প্রঞ্জল ভাষায়। এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।
বিস্মিত হয়েছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি তার বক্তব্য শুনে। কারণ আমি কিন্তু হাসিতে হাসিতে আশি পার করতে পারি নাই। জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতনসহ কিছু অত্যাচার সহ্য করেছি। এমন কিছু অত্যাচার নাই যা আমার উপর দিয়ে বয়ে যায়নি। তা সত্ত্বেও বেঁচে আছি। দাড়িয়ে আছি এবং সংসদে বক্তব্য রাখছি।
অর্থমন্ত্রী বিরাট বাজেট দিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, বাজেট বড় হলেই যে বাজেটে জনগণের কল্যাণ হবে একথা বলা যাবে না। বাজেট হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনার রূপরেখা। বাজেট দেওয়ার সঙ্গে যে সকল মন্তব্য এসেছে। যারা ব্যবসায়ী তারা বলেছেন, এমন জটিল বাজেট ইহজনমে কেউ দেখেন নাই। ব্যবসায়ীরাই তো আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সাহায্য করে। তাদের মতামত যদি বাজেট নিয়ে এরকম হয় তাহলে কি হবে?
ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে তিনি বলেন, স্বয়ং অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংকে সাগর চুরি হয়েছে। ভাল কথা। তাহলে আমাদের কিছু করার থাকে না। এই সাগর চুরির দায়ী কে। এটা বন্ধ করার জন্য কি ব্যবস্থা নিয়েছেন। সেটা তো ৯০ পৃষ্ঠার বাজেট বক্ততায় সে রূপরেখা দেয়া হয় নাই। বারবার ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়। আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করি। আর লুটপাট আরও দ্বিগুন পর্যায়ে চলতে থাকে। যারা লাখ লাখ টাকার ঋণখেলাপী তারা ঋণ অবলোপন করেন। কিন্তু কৃষকদের যে ঋণ দেওয়া হয় সেটা অবলোপন করা হয় না। আমি শুনেছি এবং দেখেছি ৩৭ হাজার কোটি অবলোপন করা হচ্ছে। এই অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে। এটা জনগণের টাকা। পেনশনের টাকা। এই টাকা অবলোপন করার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। ৩৭ হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটা পদ্মা সেতু করার পরও বেচে থাকত। সেই টাকা আপনি মওকুফ করে দিয়েছেন। এই অধিকার কিন্তু আমরা আপনাকে দেয়নি। এটা আপনার নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না বলেও মুহিতের সমালোচনা করেন এরশাদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা প্রথম।পৃথিবীর কোথাও এই ঘটনা ঘটে নাই। আপনি কি বলতে চান, এই টাকা পাচারে বাংলাদেশে ব্যাংকের কেউ জড়িত না। ফরাসউদ্দিন সাহেব তো একটা প্রতিবেদন দিয়েছেন।আপনি কেন প্রকাশ করেন না। কেন অপরাধীদের ঢেকে রেখেছেন।কেন এদের আড়াল করে রেখেছেন। কেন সেটা জনগণের সামনে প্রকাশ করেন না। তাদের বিচার করুন। আপনার কি ভয়? কেউ অন্যায় করে বেঁচে যাবে সেটা হতে পারে না। লুটপাট হতে চলবে আর প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেবেন না। এটা বিচারহীনতার লক্ষণ।




