অবসরের পর রায় লেখা বা দ্রুত রায় লেখা নিয়ে যারা টকশো’ করেন তারা এর পক্ষে না বলে উল্টো প্রধান বিচারপতিকে হেয় করার চিন্তা করেন বলেন মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বিচারকদের হাতে লেখা সাক্ষ্যগ্রহণের পদ্ধতি বদলে সিলেটের ২০টি আদালতে ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং এর উদ্বোধনকালে ০২ মার্চ দুপুরে এমন মন্তব্য করেন তিনি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজকে কোনো কোনো বিচারকের কাছে, কোনো কোনো বিচারক অবসরে গেছেন। যাদের কাছে ৬/৭ বছরের পুরোনো রায় পড়ে আছে। আমি যখন এ কথাগুলো (দ্রুত রায় দেওয়া/অবসরের পর রায় না লেখা) বলি। আমাদের যারা সমাজের যারা ভালো কথা বলেন, যারা বিভিন্ন টকশো’তে কথা বলেন। এ কথাগুলো তাদের কাছে ইয়ে হয় না। উল্টো তারা প্রধান বিচারপতিকে কী রকম যেন হেয় করা যায় এটা চিন্তা করেন’।
তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের দেশে মিডিয়া যথেষ্ট স্বাধীনতা লাভ করেছে। আজকে মিডিয়াতে অনেক কিছু দেখি। টকশো’তে রাত হলে আলোচনা হয়। কিছু কিছু মিডিয়াতে, প্রিন্ট মিডিয়াতে বিচার বিভাগ নিয়ে আলোচনা হয়। আমি এ অনুষ্ঠানে সবাইকে বলতে চাই, আমাদের মিডিয়া বা লিবার্টি আছে। কিন্তু এটা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতে। তবে এখানে আইনের বাধা নিষেধ সাপেক্ষে। বেশি লিবার্টি কিন্তু জনগণের মঙ্গল নিয়ে আসে না। এটার সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত’।
মামলাজটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে ৩০ লাখ মামলার জটের কথা বলা হয়। এটা ওভারকাম করতে পারতাম, যদি পুরনো আইনগুলোকে বাদ দিয়ে যুগোপযোগী করা যেতো। আজকে আমি টায়ার্ড হয়ে গেলাম বিবিধ কেস নিষ্পত্তি করতে করতে। স্কুল মাদ্রাসার এমপিও, জলমহালের মামলা নিষ্পত্তি করতে। এগুলো শুধু সার্কুলারে চলে। এগুলোর কোনো আইন নাই। তাই তারা মামলা করেন হাইকোর্টে। এরপর আছে ভ্যাট, কাস্টমস। তারা শুধু এসআরও জারি করে। একের পর এক এসআরও। যার একটির সঙ্গে অপরটির কোনো সামঞ্জস্য নেই। এগুলোও হাইকোর্টে আসে। এসব মামলার জন্য ৭টি বেঞ্চ রয়েছে। এগুলো নিষ্পত্তি করতে গিয়ে লাখ লাখ মামলা নিষ্পত্তিতে বাধা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আইন করলে আর মামলা হতো না। কোর্টের ওপর চাপ কমতো’। সরকারি আইনজীবীদের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হচ্ছে। ভালো আইনজীবী না থাকায় এসব মামলায় একতরফা ডিক্রি নেওয়া হয়। এদিকে কোনো অ্যাটেনশন দেওয়া হচ্ছে না’।
আইনমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ‘সরকারি আইনজীবী নিয়োগে কিছু রাজনৈতিক করেন। কিন্তু একটা স্থায়ী প্রসিকিউশন ব্যবস্থা চালু না করলে, তাদেরকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে সরকারের লাখ লাখ কোটি টাকার সম্পদ বেহাত হবে’। ডিজিটাল সাক্ষ্য ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় চালু করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ই-জুডিশিয়ারির জন্য ১০/১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী বছর থেকে পর্যায়ক্রমে সব জেলায় এ পদ্ধতি চালু করা হবে। তিনি বলেন, অনেকে ডিজিটালের সঙ্গে বিদ্যুতের কথা বলেছেন। আমি আশা করি, ২০১৮ সালের পর বিদ্যুতের সমস্যা থাকবে না। অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সিলেটের আইনজীবীর দাবির মুখে আদালতে লিফট, বার বিল্ডিং ও আদালতের সংযোগের জন্য ব্রিজ এবং লাইব্রেরির জন্য ৫ লাখ টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে প্রধান বিচারপতি অতিথিদের নিয়ে এ ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়ার্টকিন্স, সিলেট জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সরকারি কৌসুলি (জিপি) খাদেমুল মিল্লাত জালাল, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমিউল আলম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা জজ মুনির আহমেদ পাটোয়ারী।এ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নতুন যুগে পা রাখছে দেশের বিচার বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের সহযোগিতায় ইউএনডিপি’র অর্থায়নে জুডিসিয়াল স্ট্রেনথেনিং প্রকল্পের (জাস্ট) আওতায় সিলেটের ৪০টির মধ্যে ২০টি আদালতকক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরায় এ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হচ্ছে।
ওইসব আদালতে আর কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য বা জেরা হাতে লেখা হবে না। বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষ, আসামি এবং বাদী-বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের সামনেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার মনিটর থাকবে। আদালতের কম্পিউটার কম্পোজকারী সাক্ষীর সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই সকল পক্ষ তাদের সামনে থাকা কম্পিউটারের মনিটরে তা দেখতে পাবেন। নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে কি-না তাও তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এছাড়া সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে আদালতের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত কপি সব পক্ষকে সরবরাহ করা হবে।
শুধু তাই নয়, টাইপিং এর পাশাপাশি পুরো সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সমস্যার কথা মাথায় রেখে এক ঘণ্টা ব্যাকআপ রাখার মতো যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হয়েছে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় বিচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই সাক্ষীর সাক্ষ্য হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করতেন বিচারকরা। বিচার বিভাগের গত ১৪৪ বছরের ইতিহাসে এভাবে তারা সাক্ষ্যগ্রহণ করে আসছিলেন। সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর চলে জেরা। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষীকে জেরা করেন। আর এ জেরাও বিচারকদেরকে হাতে লিখে লিপিবদ্ধ করতে হয়। ফলে প্রচুর সময় ব্যয় হয়। এছাড়া বাদী বা আসামিপক্ষও নানা সময়ে অভিযোগ করে থাকেন যে, যথাযথভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ লিপিবদ্ধ হয়নি। হাইকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ বলেন, প্রধান বিচারপতির স্বপ্ন ছিলো দেড় শতাধিক বছরের প্রাচীন বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা। বিচার প্রক্রিয়ায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা। সর্বোপরি ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় সময়, শ্রম ও অর্থ খরচের পরিমাণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের কষ্ট কমিয়ে আনা। সিলেটের আদালতগুলোতে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তা সফল হবে। পরবর্তীকালে দেশের অন্যান্য আদালতেও এ ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে আশা করেন সাব্বির ফয়েজ।




