পৌরসভার নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালার ১৬টির বেশি ধারা-উপধারার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একটি ধারা সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। দুটি ধারার অপপ্রয়োগের আশংকা রয়েছে। দুটি ধারায় আছে অস্পষ্টতা। আচরণবিধির অন্তত ১১টি ধারার যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই তড়িঘড়ি বিধি সংশোধনের ফলে ত্রুটিগুলো রয়ে গেছে। অসঙ্গতিগুলোর কারণে নির্বাচনে যে কোনো পর্যায়ে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টির আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালার ২২ ধারাটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালার ১৪ ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দাবি, এমপিদের প্রচারে সুযোগ না দেয়া সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। অপরদিকে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালার ১২ ধারায় একক প্রার্থীর বিধান এবং আচরণ বিধিমালার ৭(খ) ধারায় ঘরোয়া সভার আগে পুলিশকে জানানোর বিধান প্র্রয়োগে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হয়রানির আশংকা করছে। এছাড়া নির্বাচনবিধির ১২ ধারার (ইইই) উপধারা ও আচরণবিধির ৩১ ধারায় অস্পষ্টতা রয়েছে। এ দুটির ধারা প্রয়োগে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিপত্তিতে পড়তে পারেন। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে আচরণবিধির ১১, ১২, ১৩, ১৬, ১৭, ১৮, ২০, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ ধারার যথাযথ প্রয়োগ করতে দেখা যায় না। এনিয়ে বিগত নির্বাচনগুলোতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, তড়িঘড়ি বিধি তৈরি করায় কিছু সমস্যা হতে পারে। এগুলো শুদ্ধ করে নিতে হবে। নইলে নির্বাচনে জটিলতা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, দলীয়ভাবে পৌরসভা নির্বাচনের আইন ও বিধি সংশোধনের আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংলাপ করতে পারত। এতে সবার মতের প্রতিফলন ঘটত। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ছাড়াই বিধি সংশোধনের বিষয়ে তফসিল ঘোষণার দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ (সিইসি) বলেন, সরকার আইন করার সময় আমাদের জানায়নি। একবার অধ্যাদেশ জারি করল, পরে তা বাতিল করে সংসদে আইন পাস করল। বিধি নিয়ে আমাদের দু’বার কাজ করতে হয়েছে। সময় কম, ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে হবে। তাই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসার সুযোগ হয়নি। ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পৌরসভা নির্বাচন আইনের সংশোধনী নিয়ে প্রথমে অধ্যাদেশ ও পরে জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়। এ কারণে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিধিমালায় দুই ধরনের সংশোধনী আনা হয়েছে। এ কারণে ছোটখাটো কিছু ত্র“টি রয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পৌর নির্বাচনে প্রচারে সুযোগ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ এমপিরা। তাদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী এমপিদের নির্বাহী ক্ষমতা নেই এবং সার্বক্ষণিক সরকারি সুবিধাভোগ করেন না। কিন্তু পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১৫-এর ২২ ধারায় তাদের সরকারি সুবিধাভোগী উল্লেখ করে নির্বাচনী প্রচার থেকে দূরে রাখা হয়েছে। ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, সংবিধানে এমপিদের প্রচারের সুযোগের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা নেই। তবে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০০৮-এর ১২ ধারায় সরকারের এমপিসহ সুবিধাভোগী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছাড়া প্রচারে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনে এসব ব্যক্তিকে প্রচারে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। সংসদ ও পৌরসভা উভয়টিতে দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও দুই ধরনের বিধান করায় প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশংকা, এমপিদের প্রচারের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট হলে নির্বাচনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। নির্বাচনবিধি ও আচরণবিধির দুটি ধারার অপপ্রয়োগের আশংকা করছেন বিরোধী দলগুলো। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে পাঁচজন মনোনয়ন দেয়ার বিধান থাকলেও পৌরসভায় সেই সুযোগ রাখা হয়নি। এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই একক প্রার্থী নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে নির্বাচনবিধির ১২ ধারায়। সংশোধিত বিধিতে বলা হয়েছে, ‘কোন রাজনৈতিক দল কোন পৌরসভায় মেয়র পদে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করতে পারবে না। একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভায় ওই দলের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।’ সংশ্লিষ্টদের মতে, যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে ত্র“টির কারণে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে ওই পৌরসভায় সংশ্লিষ্ট দলটির কোনো প্রার্থী ও প্রতীক থাকবে না। বিএনপির আশংকা, নানান অজুহাতে তাদের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হতে পারে। এতে ওই পৌরসভায় নির্বাচন থেকে বঞ্চিত হবে দলটি। এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজনকে মনোনয়ন দেয়ার বিধান রাখায় যাচাই-বাছাইয়ের কোনা পর্যায়ে কোনো দলের প্রার্থিতা বাতিল হলে সেই দলের কোনো প্রতীক ও প্রার্থী থাকবে না। এ বিধানটি রাখা সমীচীন হয়নি। জাতীয় সংসদের মতো এখানেও একাধিক প্রার্থী দেয়ার বিধান রাখতে পারত। এছাড়া পথসভা ও ঘরোয়া সভার ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানানোর বিধানের অপপ্রয়োগের আশংকা করছে বিএনপি। এবার প্রচারণার ক্ষেত্রে আচরণবিধির ৭(খ) ধারায় নতুন শর্ত দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- ‘পথসভা ও ঘরোয়া সভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে তার স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, যাতে উক্ত স্থানে চলাচল ও আইন-রক্ষার জন্য পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।’ কতজন নিয়ে বৈঠক করলে ঘরোয়া সভা হিসেবে গণ্য হবে এতে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। বিরোধী দলগুলোর মতে, নতুন এ শর্তে পুলিশকে হয়রানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সভার বিষয়টি পুলিশকে আগভাগে জানানোর ফলে হয়রানি বাড়বে। গোপন সভার নামে ধরপাকড় বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। প্রশাসনকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরা বিএনপির প্রার্থীসহ দলের নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যে আচরণবিধি করেছে এতে সরকারি দলকে পরোক্ষভাবে বাড়তি সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে সব জায়গায় যদি পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাহলে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকবে না। এছাড়া নির্বাচনবিধির ১২ (ইইই) উপধারায় অস্পষ্টতা রয়েছে। এতে পৌরসভার নির্বাচিত মেয়রদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ১০০ জনের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এতে পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যানদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে ১০০ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হবে কিনা সে বিষয়ে বিধিতে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এ বিষয়টি নিয়ে তারাও নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। সাবেক চেয়ারম্যানরা এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা সঠিক কোনো জবাব দিতে পারছেন না। তারা জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যান পদটির নাম পরিবর্তন করে মেয়র করা হয়েছে। বিধির এ ধারার কারণে ২০১১ সালে নির্বাচিতরা এ সুযোগ পাবেন, নাকি আগের নির্বাচিতরাও একই সুযোগ পাবেন তার ব্যাখ্যা কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে চেয়েছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৯৯ ও ২০০৪ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। এবার আমি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছি। দল থেকে মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যানদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ভোটারদের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দিতে হবে কিনা সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো তথ্যই জানাতে পারেননি। ৩১ ধারায় নির্বাচনীবিধি লংঘনের দায়ে ছয় মাস কারাদণ্ড ও অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বিধান থাকলেও কোন প্রক্রিয়ায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে ছিল না। মেয়র পদটি প্রচলিত হওয়ায় বিধিতে সেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চেয়ারম্যান পদটি যেহেতু মেয়র নামকরণ করা হয়েছে, তাই দুটি পদই সমমর্যাদাসম্পন্ন। পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যানদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ভোটার সমর্থনসূচক তালিকা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। ইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিগত নির্বাচনে আচরণ বিধিমালার ৩, ১১, ১২, ১৩, ১৬, ১৭, ১৮, ২০, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ ধারার যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। এনিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে কমিশন। বিধিমালার ৩ ধারায় সব দলের প্রার্থীদের সমান প্রচারণার সুযোগ দেয়া, ১১ ধারায় ৫ জনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল ও সংগ্রহের ওপর বিধি-নিষেধ, ১২ ধারায় নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপনে বিধি-নিষেধ, ১৩ ধারায় যানবাহন ব্যবহার সংক্রান্ত বাধা-নিষেধ, ১৭ ধারায় উপঢৌকন প্রদান সংক্রান্ত বাধা-নিষেধ, ১৮ ধারায় উস্কানিমূলক বক্তব্য, বিবৃতি ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ওপর বাধা-নিষেধ রয়েছে। তাদের মতে, বিভিন্ন মহলের চাপের কারণে এসব ধারার যথাযথ প্রয়োগ হয় না।



