চলমান সংকট নিরসনে সংলাপের সম্ভাবনা আবারও নাকচ করেছে সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘খুনিদের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়।’ চলমান সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দুই নেত্রীকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির জবাব দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে ৩০ জানুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন চিঠি লেখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিন আগে চিঠিটি সরকারের হাতে আসে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার এই চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। যদিও বিএনপির তরফ থেকে চিঠি পাওয়া কিংবা না পাওয়ার ব্যাপারে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলা হয়নি। তবে বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছে, জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠি পেয়েছেন খালেদা জিয়া।জাতিসংঘ মহাসচিব সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে চলমান সহিংসতা নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বুধবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন এটি আমি আপনাদের কনফার্ম করছি। আমরা কয়েক দিন ধরে শুনছিলাম, কিন্তু অ™ু¢ত এক কারণে চিঠিটি আমাদের কাছে দুই সপ্তাহ পরে পৌঁছেছে। আমরা জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিকে কেন দেরি হল সেটা জানতে বলেছি।’জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠিতে কী লেখা আছে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চিঠিতে তিনি বর্তমান সহিংসতার নিন্দা করেছেন। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংসতা যাতে না হয়, সেজন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।’পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এর আগে আপনারা দেখেছেন, বাংলাদেশের চলমান সংকট নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করার জন্য তারানকোকে দায়িত্ব দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। এ চিঠিতে খালেদা জিয়াকেও একটি চিঠি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর কনটেন্ট আমার জানা নেই।’প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘চিঠিতে বর্তমান ভায়োলেন্সকে ডিএসকালেট করার জন্য’ বলা হয়েছে। তারানকোর সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ের বরাত দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে সফরের কোনো সম্ভাবনা নেই বা সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই। তবে চিঠিতে বলা আছে আমরা যদি চাই, প্রয়োজন হলে তিনি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আসতে পারেন।’ এটাকে কি আপনারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপ হিসেবে দেখছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কোনো চাপ নয়। আপনারা দেখেছেন বাংলাদেশে একে একে নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আসছেন, তাদের সবার সঙ্গে আপনাদের কথা হয়েছে, সেখানে কোথাও কোনো চাপের বিষয় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সরকারের কোনো কর্মকাণ্ড যাতে সমালোচনার মুখে না পড়ে’ সে দিকটি আমরা খেয়াল রাখব।জাতিসংঘ মহাসচিব চিঠিতে সংলাপের কথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, ‘চিঠিতে তিনি অনেক কথাই বলেছেন।’ সংলাপের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কি জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। কোনো খুনির সঙ্গে আমরা সংলাপ করতে চাই না। আই ডোন্ট সি এনি ডায়লগ। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি চিঠির একটা জবাব যাবে।’বাংলাদেশে চলমান সহিংস পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট সংকট উত্তরণে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সম্প্রতি সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেস তারানকোকে এ সংক্রান্ত বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন। তারানকো সরকার ও বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করবেন। ইতিমধ্যেই তিনি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের অংশ হিসেবে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে দেখা করে আলোচনা করতে চেয়েছেন। আবদুল মোমেন অবশ্য এখনও তারানকোকে বৈঠকের কোনো সময় দেননি। অপরদিকে আর্জেন্টিনার কূটনীতিক তারানকো টেলিফোনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।চলমান সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় কূটনৈতিক মহলে আলাপ-আলোচনা চলছেই। জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় কয়েকজন কূটনীতিক অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারের বাসভবনে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। এ ধরনের বৈঠক কূটনৈতিক পাড়ায় নিয়মিতই হচ্ছে। তারা পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে রাজধানীতে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন।এদিকে, জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান খান নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংকালে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে চলতি বছরের শুরু থেকে সহিংসতা চলতে থাকা এবং প্রাণহানিতে আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। মহাসচিব ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। আমি এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছি’।অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, ‘বর্তমানে ফার্নান্দেজ তারানকোর বাংলাদেশ সফরের কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি ইতিপূর্বে সেখানে গিয়েছিলেন। মহাসচিব তাকে সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তিনি সেই কাজ করছেন। এই মুহূর্তে তার সফরের কোনো ঘোষণা দেয়ার নেই’।১৪ দলের বৈঠক : বুধবার ধানমণ্ডিতে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকেও সংলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিষ্কার করেছেন আওয়ামী লীগসহ শরিক দলগুলোর নেতারা। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অনেকে অনেকভাবে আশা প্রকাশ করতে পারে। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল। যারা দানবের মতো মানুষের ওপর হামলা করে তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।বৈঠকে আগামীকাল ঢাকায় চলমান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আয়োজিত র্যালি উপলক্ষে ব্যাপক শোডাউনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে র্যালি শুরু করে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে গিয়ে শেষ হবে।



