শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়মায়ের দৃঢ়তা ও ত্যাগ আমার রাজনৈতিক জীবনের জন্য শিক্ষণীয় : প্রধানমন্ত্রী

মায়ের দৃঢ়তা ও ত্যাগ আমার রাজনৈতিক জীবনের জন্য শিক্ষণীয় : প্রধানমন্ত্রী

মায়ের দৃঢ়তা ও ত্যাগ আমার রাজনৈতিক জীবনের জন্য শিক্ষণীয়, বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি আমার মায়ের কাছ থেকে অনেক শিখেছি। তার কাছ থেকে পেয়েছি অনেক স্নেহ ও ভালোবাসা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জন্মের পর থেকেই বাবার সান্নিধ্য যদিও কম পেয়েছি কিন্তু মায়ের স্নেহ পেয়েছি পুরোপুরি। রাজনৈতিক বড় বড় মোড়গুলোতে মায়ের দৃঢ়তা, ত্যাগ ও সময়োচিত পদক্ষেপ দেখেছি। শুক্রবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার ৮৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, আমার মা নিজের ঘরে খাবার আছে কিনা, তার চেয়েও বেশি চিন্তা করতেন নেতাকর্মীরা ভাল আছেন কিনা তা নিয়ে। ভোগ-বিলাসের কথা কখনো ভাবেন নি। আবার দৈন্যতার প্রকাশও কখনো দেখিনি তার কথাও কাজে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মা রাজনীতিতে সক্রীয়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি গেরিলা কায়দায় বোরখা পরেও নেতাকর্মীদের কাছে সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিতেন এবং তাদের খোঁজখবর নিতেন। তিনি যেমন ছিলেন দৃঢ়চেতা তেমনি আত্মাবিশ্বাসে বলীয়ান। পাকিস্তানি শাসকরা বাবাকে নিয়ে গেলে ৬ মাস পর্যন্ত আমরা জানতামনা তাকে কোথায় রাখা হয়েছে। এসময় মা বিচলিত ছিলেন কিন্তু মনবল হারান নি। সবসময়ই তার ভেতরে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃঢ়তা দেখেছি। বঙ্গবন্ধু যখন জেলখানায় থাকতেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে বাজারের টাকা পৌঁছে দিয়েছেন আমার মা। তিনি ভোগ বিলাসী হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসতো না।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুকে দেখতাম প্রতিটি বিষয়ে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং মা প্রতিটি সিদ্ধান্তে সমর্থন জানাতেন। পরবর্তীতে দেখা যেত সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জেল খানায় থাকতেন এ নিয়ে কখনও তাকে আক্ষেপ করতে দেখিনি। বরং আমাদের বাড়িতে বাজার হোক বা না হোক, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ি নিজে গিয়ে বাজারের টাকা পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। কখনও তার মুখে দৈনতার কথা ‍শুনি নি। বঙ্গবন্ধু জেল খানায় থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগের এক নেতার টিবি হয়েছিল। প্রতি সপ্তাহে আমার মা তাকে দেখে আসতেন এবং আর্থিক সহায়তা করতেন।

আমার দাদা-দাদি আমাদের দেখাশোনা করতেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যখন ফ্রিজ বিক্রি করতে হলো, তখন মা বললেন এই ফ্রিজের পানি খেয়ে গলায় ঠাণ্ডা লেগে যায়, এটা রাখার দরকার নাই। গহনা যখন বিক্রি করতে হলো তখন বললেন, এগুলো পুরাতন হয়ে গেছে।

মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক দিন মা বলেছেন আজ আমরা গরিব খিচুড়ি খাব, কিন্তু প্রকাশ করেন নি বাজার করার টাকা নেই। তিনি সব সময় বলতেন আমরা মধ্যবিত্ত, আমাদের এভাবেই চলতে হবে। বাবাও এ‍কই কথা বলতেন। আমাদের শিখিয়েছেন ‘সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে চলবে, হোঁচট খাবে না’। ‘অনেক দামী কাপড় পরে তোমরা কাকে দেখাবে? যে দেশের মানুষ দু’বেলা ভাত খেতে পারে না!। মায়ের এই মানসিকতা না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসতো না।  ছয় দফা দাবিতে মায়ের সমর্থন ছিল এবং ৭ জুনের হরতালেও মায়ের অনেক অবদান ছিল। এখন তো হরতাল ডাকলেই হয়ে যায়। সে সময় প্রস্তুতি নিতে হতো। আইয়ুব খান তখন ক্ষমতায়। জেলখানায় গিয়ে নিরাপত্তার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে বাইরের অবস্থ‍া জানানো এবং ভেতর থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার কাজ গেরিলা কায়দায় মা করেছেন। পরে আওয়ামী লীগের অনেকে নেতাকর্মীই আট দফার দিকে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু মা দৃঢ় ভূমিকায় ছিলেন, ছয় দফাই থাকবে। সময় মতো সেসব নেতাকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হন।

শেখ ফজিলাতুন নেসা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল শক্তি যুগিয়েছিল, তার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আমরা মা। লেখাপড়ার ব্যাপারে মায়ের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সে সময়ের সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের লেখা-পড়া করার খুব একটা সুযোগ ছিল না। সে কারণে একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণ মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু লেখা-পড়ার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল।

তিনি আরো বলেন, বাবা জগৎখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ফিলশফিতে বিশ্বাস করতেন। তাই মাঝে মধ্যেই মাকে রাসেলের ফিলোসফি শোনাতেন। সে কারণেই আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের মা তার নাম রাখেন রাসেল। সংসার জীবনে মায়ের অপরিসীম ত্যাগের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আরো বলেন, খুব কম বয়সে বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ে হয়েছিল। সেই অল্প বয়স থেকে বাবার পাশে ছায়ার মতো লেগে থেকেছেন মা। আমরা মনে হয় মায়ের মতো জীবনসঙ্গী না পেলে বাবা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারতেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মায়ের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অপরিসীম অবদানের কথা মাথায় রেখেই ১৫ আগস্টের খুনিরা মাকেও রেহায় দেয়নি। গণহত্যার শিকার ফিলিস্তিনির নারী শিশুদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আজ যখন নির্বিচারে ফিলিস্তিনির নারী শিশুদের হত্যা করতে দেখি তখন একাত্তরের কথা মনে পড়ে যায়। ওই সময় বাংলাদেশের নারী ও শিশুদেরকেও একইভাবে হত্যা করা হয়েছে।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে (বাংলাদেশে) একটা মৃত্যুও ঘটনা ঘটলেই কত কংগ্রেসম্যানের চিঠি পাই, কত প্রতিবাদ শুনতে পাই। কিন্তু আজ যখন ফিলিস্তিনের নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তখান তারা নীরব কেন? আমরা এর প্রতিবাদ ঘৃণা জানাই।

এসময় দেশীয় মানববাধিকার সংগঠনগুলোরও সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কিছু ঘটলেই দেখি বিবেকের তাড়ণায় তারা চট্টগামের ছুটে যান, চরে ছুটে যান। এখানে যান, ওখানে যান। এখন তারা চুপ করে আছেন কেন? এর আগে সকাল ৮টায় বঙ্গমাতার বনানী কবরস্থানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করেন।

  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ