রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়দূতাবাসে ব্যাপক রদবদল প্রক্রিয়া শুরু: কমে যাচ্ছে রাজনৈতিক নিয়োগ

দূতাবাসে ব্যাপক রদবদল প্রক্রিয়া শুরু: কমে যাচ্ছে রাজনৈতিক নিয়োগ

আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে ব্যাপক রদবদল প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বিতর্কিত, অদক্ষ এবং অপেশাদারদের সরিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মাধ্যমে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক বন্ধন দৃঢ় করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য মিটিয়ে ফেলা হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে বিরাজমান বিবাদও। বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পরিবর্তনে ‘কূটনৈতিক কৌশল’ ফলপ্রসূ হওয়ায় সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে দূতাবাসগুলোয় পরিবর্তন আনতে চাইছে। তবে এ প্রক্রিয়াকে নিয়মিত রুটিন কাজের অংশ হিসেবেই মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক বিবেচনায় ভারতে নিযুক্ত হাইকমিশনার তারেক এ করিমকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তার স্থলে সাবেক কূটনীতিক সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীকে নিয়োগ করা হচ্ছে বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে কূটনৈতিক মহলে। সেখানকার ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে যাচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী। এ ছাড়া কাজী ইমতিয়াজ হোসেনকে থাইল্যান্ড থেকে সরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে। তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক সাইদা মুনা তাসনীম। রাষ্ট্রাচারপ্রধান খন্দকার মোহাম্মদ তালহা যাচ্ছেন লন্ডনের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা অনুবিভাগের মহাপরিচালক তারিক আহসানকে শ্রীলংকার রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে আর শ্রীলংকা থেকে মো. সুফিউর রহমানকে পাঠানো হচ্ছে মিয়ানমারে, নিজ বাসায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত ওয়াহিদুর রহমানকে মিশরে, প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালক আল্লামা সিদ্দিকীকে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ জিয়াউদ্দিন আহমদকে ইতিপূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সেখানকার প্রেস মিনিস্টার স্বপন সাহাকে ঢাকায় ফেরত আনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে কলকাতা মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন মোফাখ্খারুল ইকবাল। সে সময় পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস কাউন্সিলর পদে একই মন্ত্রণালয়ের অপর কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহকে নিয়োগ দেওয়া হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে বিধিবহির্ভূত বলে আপত্তি তোলায় তার নিয়োগ বাতিল হয়। বর্তমানে আবারও ওই পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করতে প্রার্থী বাছাই চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া কলকাতা মিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম ও নয়াদিল্লি হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার মাহবুব হাসান সালেহকে অল্পদিনের মধ্যেই দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে দূতাবাসগুলোর এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেশাদার কূটনীতিক না হওয়ায় অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যে কারণে সরকারকে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। তবে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ওয়ালিউর রহমান বলেন, রাজনৈতিক কিংবা অন্য বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এক লোক বছরের পর বছর একই পদে চাকরি করতে পারেন না। তিনি দেশকে কিছু দিতে পারেন না। তাদের সরিয়ে নতুন এবং মেধাবীদের নিয়োগ দিলে তাতে সরকারেরই লাভ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ে সরকার। তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে সে চাপ ধীরে-ধীরে অনেকটাই কেটে গেছে। তাই সরকার এখন চাপ মোকাবিলা নয়, সম্পর্ক বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবেই দূতাবাসগুলোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে দূতাবাসগুলোয় রদবদলের বিষয়টিকে সরকারের নিয়মিত কর্মকা- দাবি করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ায় সরকারও তার নিয়মিত কাজে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। এতে করে দূতাবাসগুলোর কাজে গতি বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি। রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই নিয়ে থাকে। পেশাদার কূটনীতিকদের বাইরে দক্ষ ও যোগ্য দেখে বিধি অনুযায়ী দূতাবাসে নিয়োগের রেওয়াজ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে ১০১টি পদ সৃষ্টি করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপড়েনও তৈরি হয়। বিষয়টি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ালেও পরে তারই হস্তক্ষেপে এর সুরাহা হয়েছে। বর্তমানে সৃজনকৃত এসব পদে পদায়ন প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।
এদিকে সরকারের বাণিজ্যমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে দূতাবাসগুলোর কমার্শিয়াল উইংকেও শক্তিশালী করার চিন্তা রয়েছে বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এখন কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্যমুখী সম্পর্ক বাড়াতে মনোযোগী। তাই মিশনগুলোর কমার্শিয়াল উইংয়ে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া একসঙ্গে অনেকগুলো দূতাবাসে রদবদল এবং নতুন লোক নিয়োগের ফলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-সংকট দেখা দিয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান।
  • বিষয়:
  • top
আরও পড়ুন

সর্বশেষ