ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ কমার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক হারে কমেছে ঝুঁকির বিপরীতে অর্থ সংরক্ষণে (প্রভিশন) ঘাটতির পরিমাণও। বিদায়ী বছরের শেষ বা ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। যা এর আগের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ছিল ৩ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ কমেছে ৩ হাজার ২৪ কোটি এক লাখ টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-নমনীয়তার সুযোগে ব্যাংকগুলোতে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের হিড়িক দেখা গেছে।
মূলত ঋণ পুনঃতফসিলের কারণেই এত পরিমাণ প্রভিশন ঘাটতি কমেছে বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো উদ্দেশ্যে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো আদায় না হওয়া ঋণকে খেলাপি না করে নিয়মিত করেছে। ফলে একদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে। সেই সঙ্গে কমেছে ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, বিদায়ী বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে ব্যাংকগুলোকে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করেছে। ফলে ব্যাংকের মুনাফা অনেক বেড়ে গেছে। যেহেতু মুনাফা থেকেই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়, তাই ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে। ফলে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ কমে এসেছে। সাবেক এই গভর্নর বলেন, আপাত দৃষ্টিতে তা ভালো মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কেননা তখন খেলাপি ঋণের পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের ব্যাংকগুলোকে ঋণের ঝুঁকি বিবেচনায় নির্দিষ্ট একটি অংশ প্রভিশন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৬ সালের জুনে ঋণের মান বিবেচনায় নিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণের নির্দিষ্ট হার ঠিক করে দেয়। সে অনুযায়ী অশ্রেণীকৃত বা সাধারণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে এক থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে বলা হয়েছে ২০ শতাংশ। আর খেলাপি ঋণের সাব স্ট্যান্ডার্ডের (এসএস) ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ, সন্দেহমূলক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা ক্ষতিকর ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কোন ধরনের ঘাটতি না থাকলেও বিশেষায়িত ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এ খাতের ব্যাংকগুলোর মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে। এ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৯৭ কোটি ৮০ লাখ এবং বেসিক ব্যাংকের ১২৬ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত প্রভিশন রয়েছে ১ হাজার ৪৫৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রয়েছে ৫৯৫ কোটি ৩৯ লাখ, জনতার ৭২৯ কোটি ৩২ লাখ, রূপালীর ১২৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এ সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের কোন উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি নেই। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কমার্স ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংকেই উদ্বৃত্ত প্রভিশন রয়েছে। এসব ব্যাংকে মোট উদ্বৃত্ত প্রভিশনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। তবে কমার্স ব্যাংকে ১৬ কোটি ৫০ লাখ ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ১০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোতে ৬৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত প্রভিশন রয়েছে।




