দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সঙ্কট এখন খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর ধরে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, তা ব্যাংকগুলোর মূলধন, মুনাফা, তারল্য এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এই হতাশার মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে ২৪টি ব্যাংক। গত এক বছরে এসব ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে সক্ষম হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে আসা অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা। তবে এটিকে পুরো ব্যাংক খাতের উন্নতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনও ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি তিন টাকার এক টাকারও বেশি এখন খেলাপি। তবে একই সময়ে ২৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে, যা সামগ্রিক সংকটের মধ্যেও ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ২০২৫ সালের মার্চে ২৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে বছর শুরু করলেও ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকটি প্রায় ৮২১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের খেলাপি ঋণ আট হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা থেকে কমে আট হাজার ২৬৬ কোটি টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটিরও বেশি খেলাপি ঋণ কমেছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন, আদায় কার্যক্রম জোরদার করা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কিছু অর্থ আদায়ের কারণে খেলাপি ঋণ কমেছে। পাশাপাশি কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর আদায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়াও ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমলেই হবে না, নতুন করে যেন ঋণ খেলাপি না হয়, সে বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য ঋণ অনুমোদনে সুশাসন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঋণ বিতরণের পর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। ব্যাংক এশিয়া পিএলসি চার হাজার ৫৫ কোটি টাকা থেকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দুই হাজার ১২৯ কোটি টাকায় এনেছে। ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার ৬৪৪ কোটি টাকায় নামিয়েছে। ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৯০ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক তিন হাজার ২১০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে দুই হাজার ৪২৭ কোটি টাকায় এনেছে। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৬৬৫ কোটি টাকা থেকে কমে ৫৩২ কোটি টাকায় নেমেছে। যমুনা ব্যাংক এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৬২৬ কোটি টাকায় এনেছে, যা শতকরা হিসাবে বড় ধরনের উন্নতি।
এ ছাড়া মার্কেন্টাইল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৯৫০ কোটি টাকা হয়েছে। মিডল্যান্ড ব্যাংক ৩৬৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২৯৬ কোটি টাকায় এবং মধুমতি ব্যাংক ৬৩০ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ২২৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৫৮২ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৮৯০ কোটি টাকা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের খেলাপি ঋণও ২৭ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা থেকে কমে ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরে তিন হাজার কোটির বেশি খেলাপি ঋণ কমেছে ব্যাংকটির। এনসিসি ব্যাংক এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার ১২৩ কোটি টাকায় এনেছে। এনআরবি ব্যাংক এক হাজার ২৬৪ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫৭৮ কোটি টাকায় নামিয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
অন্যদিকে ওয়ান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ২০৯ কোটি টাকা থেকে কমে তিন হাজার ৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রাইম ব্যাংক এক হাজার ৪২১ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক দুই হাজার ৬০১ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৭৩১ কোটি টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ৮২৯ কোটি টাকা থেকে কমে এক হাজার ৪৫৮ কোটি টাকায় নেমেছে। এ ছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ৯২৫ কোটি টাকা হয়েছে। সিটি ব্যাংক দুই হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় এনেছে। ট্রাস্ট ব্যাংক দুই হাজার ২৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে দুই হাজার ১৮ কোটি টাকা এবং উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক হাজার ২৬৫ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে এক হাজার ২১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরো গভীর হতে পারে বলে তাদের মত।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঋণ পুনঃ তফসিলের একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে বলা হয়, মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করতে পারবেন গ্রাহক। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আবেদনের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ডাউন পেমেন্ট ২ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি হলো খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দুর্বল ব্যাংকগুলো সময়মতো ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ২৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে আসা একটি ইতিবাচক সূচনা হলেও এটিকে স্থায়ী প্রবণতায় রূপ দিতে না পারলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটবে না। খেলাপি ঋণ কমানোর এই ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা, নতুন ঋণ বিতরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে। তবে এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।




