দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইউনাইটেডকমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি) বর্তমানে এক গভীর আর্থিক ও পদ্ধতিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসের (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকটির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই নিম্নমুখী।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে আমানত ব্যয় বা সুদবাবদ খরচ (ইন্টারেস্ট এক্সপেন্স) ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদহারের এই বিশাল অসামঞ্জস্যতা ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ফলে ব্যাংকের নিট মুনাফায় এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে যেখানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ২২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে তা প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। মুনাফার এই রেকর্ড পতনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অস্বাভাবিক সুদ ব্যয়কে।
ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পরিচালন মুনাফাও বাড়ার কথা। কিন্তু ইউসিবির ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। গত এক বছরে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ (লোনস অ্যান্ড অ্যাডভান্সেস) প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৩ হাজার ৩৫ কোটি ৪০লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণের এই বিশাল প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ব্যাংকের অপারেটিং প্রফিট বা পরিচালন মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর অর্থ হলো—বিতরণকৃত ঋণের একটি বড় অংশই আয় উৎপাদন করতে পারছে না, অথবা ব্যাংক সেগুলো কার্যকরভাবে রিকভারি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ব্যাংক যখন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রশাসনিক ব্যয়ে কোনো ধরনের কৃচ্ছ্রসাধন লক্ষ্য করা যায়নি। গত দেড় বছরে ব্যাংকটিতে প্রায় ৩,০০০ নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল নিয়োগের ফলে বেতন ও ভাতা বাবদ ব্যাংকের স্থায়ী খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, এ বছর পারফরম্যান্স ঘাটতির কারণে সাধারণ কর্মীদের ইনসেনটিভ বোনাস বন্ধ থাকায় ব্যাংকটির প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেতন-ভাতা খাতে এই সাশ্রয়ের কোনো প্রতিফলন নেই। উল্টো শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তুষ্ট রাখতে তাঁদের বেতন বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সাশ্রয় হওয়া অর্থ খরচ করে ফেলা হয়েছে।
ব্যাংকের প্রকৃত লোকসান ও দুর্বল অবস্থা আড়াল করতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু ‘আর্থিক কারসাজির’ আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা:
এক. অবচয় খরচ কমিয়ে দেখানো: অপারেটিং খরচ কম দেখাতে এ বছর ডেপ্রিসিয়েশন বা অবচয় খরচ প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে দেখানো হয়েছে।
দুই. পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখা: লোন পোর্টফোলিও বা ঋণের স্থিতি ৫,০০০ কোটি টাকা বাড়লেও সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় ঝুঁকি সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখা হয়নি। পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ না করা মানে হলো—ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকটি অপ্রস্তুত থাকছে, যা সাধারণ আমানতকারীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
তিন. পরিচালক সংখ্যা কমলেও ফি অপরিবর্তিত: ব্যাংকটির পরিচালক সংখ্যা ২০ জন থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ জনে নামিয়ে আনা হলেও, বোর্ড মিটিং এবং অন্যান্য ডিরেক্টর ফি বাবদ ব্যয়ের পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় অপরিবর্তিত রয়েছে। পরিচালক সংখ্যা ৭৫ শতাংশ কমলেও এই খাতে ব্যয় না কমা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
চার. আইনি ও বিজ্ঞাপন ব্যয়: আইনি খরচ (লিগ্যাল এক্সপেন্সেস) দ্বিগুণ হয়েছে এবং বিজ্ঞাপন ব্যয়ও অপরিবর্তিত রয়েছে, যা আর্থিক সংকটের সময়ে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইউসিবির ভঙ্গুর আর্থিক অবস্থা ব্যাংকটির সুশাসনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখা, ডেপ্রিসিয়েশনে কারসাজি এবং অস্বাভাবিক নিয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী ব্যয় বাড়ানো ব্যাংকটিকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। সংস্কারের লক্ষ্যে ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ দেওয়া হলেও সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রাধান্য না দিয়ে নিজস্ব স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে ব্যাংকটি বিগত দেড় বছরে আরও পিছিয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এই কৃত্রিম মুনাফার হিসাব ও ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে থাকা প্রকৃত কারণগুলো খতিয়ে দেখা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। ব্যাংকটির আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে ও সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।




