ষ্টাফ রিপোর্টার (বিডিসময়২৪ডটকম)
আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে বিকালে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) হানাদার পাকিস্তানী সেনারা মাথা নিচু করে যৌথ কমান্ডের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া মহান বিজয় দিবসে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
যে অস্ত্র দিয়ে তারা দীর্ঘ নয় মাস বাঙালির রক্ত ঝরায়, ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নেয় সেই বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে এক রাশ হতাশা এবং অপমানের গ্লানি নিয়ে দুরন্ত বাঙালির কাছে পরাজয় মেনে নেয়। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। বাঙালির শৌর্যবীর্য এবং বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিবস।
এবারের বিজয় দিবস উদযাপনের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। শোক আর রক্তের ঋণ শোধ করার গর্ব নিয়ে উজ্জীবিত জাতি দিবসটি পালন করবে অন্যরকম অনুভূতি নিয়ে। বিজয় দিবসের মাত্র কয়েক দিন আগে ১২ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় স্বভাবতই অনুপ্রাণিত গোটা জাতি। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত অন্তত একটি মামলার রায় কার্যকর হওয়ায় বাকি যুদ্ধাপরাধীদেরও একই পরিণতি হবে এই আশাবাদ এবং প্রত্যাশা নিয়েই উদযাপিত হবে এবারের বিজয় দিবস।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘যার যা কিছু আছে’ তা নিয়েই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। পরে ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে চূড়ান্তভাবে তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালিরা অস্ত্র হাতে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই মুক্তিযুদ্ধে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, ভুটান, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাহায্য-সহযোগিতা করে। অবশেষে বাঙালি দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে বুকের উষ্ণ রক্তে রাঙিয়ে রাত্রীর বৃন্ত থেকে ছিনিয়ে আনে ফুটন্ত সকাল। অফুরন্ত আত্মত্যাগ এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয় দিবসে তাই আনন্দের সাথে যোগ হয়েছে বেদনাও।
এই মহান বিজয়ের ৪২ বছর পূর্ণ হলো আজ।
বিজয়ের এই ৪২ বছর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে জাতি। কখনো সামনে এগিয়েছে, আবার পিছিয়ে গেছে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়নে। তবুও হতোদ্যম হয়নি জাতি। বিলম্বে হলেও শুরু হয়েছে ইতিহাসের দায়-মোচনের প্রচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে-শেষ হওয়ার পথে একাত্তরের মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। হার না মানা বাঙালি অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং ক্রীড়াতেও উড়াচ্ছে বিজয় নিশান।
আজ কৃতজ্ঞ জাতি সশ্রদ্ধ বেদনায় স্মরণ করবে দেশের পরাধীনতার গ্লানি মোচনে প্রাণ উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামবে। শ্রদ্ধার সঙ্গে তারা শহীদের উদ্দেশে নিবেদন করবেন পুষ্পাঞ্জলি। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব প্রান্তের মানুষ অংশ নেবে বিজয় দিবসে। বঙ্গবন্ধুর বজ্র নিনাদ ভাষণ আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জাগরণী গানে আকাশ-বাতাস হবে মুখরিত।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘স্বাধীনতার সুফল জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে দলমত নির্বিশেষে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘মহান বিজয় দিবস জাতীয় জীবনে এক অনন্য গৌরবময় দিন। বিজয়ের এই মহান দিনে আমি সেইসব অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধা জানাই; যারা দেশের স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি। সেই সঙ্গে জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সব বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বস্তরের জনগণকে শ্রদ্ধা জানাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিসীম ত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা অর্জন এবং সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। বিজয়ের চার দশক পার হলেও সে লক্ষ্য আজো পুরোপুরি অর্জন করা সক্ষম হয়নি।’ দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
অপর এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা হবে। তিনি এ লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আত্মনিয়োগ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি নয় মাস মরণপণ যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।’
বিজয় দিবস সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হবে। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় করা হবে আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হবে। সংবাদপত্র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবে, বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।
কর্মসূচি: প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে একাত্তরের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাবেন। বিরোধীদলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া অনুরূপভাবে সাভারে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন।
এছাড়া বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজধানীর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে আছে সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশের সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন।
সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
বিকাল ৩টায় ঢাকা মহানগরের সব থানা ও শাখা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও জাতীয় সংসদ সদস্যগণ স্ব স্ব এলাকা থেকে বিজয় র্যালিসহ পাক হানাদারদের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানে সমবেত হবেন এবং সেখানে স্থাপিত শিখা চিরন্তনে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করবে।




