মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স : বাবার মতো ছেলেও ঋণখেলাপি

এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স : বাবার মতো ছেলেও ঋণখেলাপি

সময়টা ছিল ২০১০ সাল। চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ী শামসুল আলমের নেতৃত্বে এমইবি (মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স) গ্রুপের ব্যবসা ডুবন্ত তরীর মতো আস্তে আস্তে ডুবছে। সে সময়ে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও তেল ব্যবসায় লোকসানে এমইবি ঋণখেলাপি হয় একাধিক ব্যাংকে। পরবর্তীকালে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রায় একই সময়ে তার ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব রিয়াদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নাহার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। কিন্তু বাবার মতো ব্যবসায়িক ব্যর্থতায় তার মালিকানাধীন এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সও এখন এবি ব্যাংকের খেলাপি তালিকায়। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে এবি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার পাওনা ১০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

বিভিন্ন ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে চট্টগ্রামের বাকলিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াছ ব্যবসায় আসেন। আর স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ইউনিলিভারের প্রধান পরিবেশক হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন প্রায় তিন যুগ। পরে ২০০০ সাল নাগাদ ইউনিলিভারের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে তোলেন মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স। একসময় দেশের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় তথা ভোজ্যতেল আমদানি ও বিপণনে নেতৃত্ব দেয় মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স। পাশাপাশি দাদা সয়াবিন তেল, ড্রিংকিং ওয়াটার, গ্লাস, নিটিংসহ একাধিক ব্যবসা শুরু করে গ্রুপটি।

২০০৫-০৬ সালের দিকে ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য ব্যবসায় অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বে ব্যবসায়িকভাবে ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে থাকে এমইবি গ্রুপ। এর মধ্যে মোহাম্মদ ইলিয়াছের বড় ছেলে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামসুল আলম ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে সংসদ নির্বাচন করেন। তখন তিনি ব্যবসা ছেড়ে রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম অনেক কমে গেলে বিশাল পরিমাণ আমদানি নিয়ে বিপাকে পড়ে এমইবি। সব মিলিয়ে ২০১০ সাল থেকে ব্যবসায় লোকসান ও মন্দার ছোঁয়া লাগে। আর ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে একের পর এক বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে।

অপরদিকে তার ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব রিয়াদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নাহার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। এ গ্রুপের প্রধান বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পণ্যের তালিকায় আছে দাদা সয়াবিন তেল, ড্রিংকিং ওয়াটার, কোমল পানীয়, বিটুমিন ইত্যাদি। শোয়েব রিয়াদও তার বাবার মতো ব্যবসায়িক ব্যর্থতায় এখন এবি ব্যাংকের খেলাপি তালিকায়। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে এবি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার সুদাসলসহ মোট পাওনা ১০৫ কোটি ২৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

এক বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয় এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। পাওনা আদায়ে এবি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা আগামী ২০ নভেম্বর ঋণের বিপরীতে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা মৌজার ১৯১ শতক এবং ঢাকার উত্তরায় ৩৬ দশমিক ৫২ শতক বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করে। এতে আগ্রহী যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে এবি ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, চলতি মাসে আমাদের শাখায় খেলাপি হয়েছে এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স লিমিটেড। তাই প্রতিষ্ঠানটির ঋণের বিপরীতে বন্ধক থাকা সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পুনঃতফসিলকরণের জন্য আবেদন বা প্রস্তাব আসেনি। খেলাপি ঋণের বিষয়ে এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শোয়েব রিয়াদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। আর সরাসরি মন্তব্য জানতে চট্টগ্রামের মেহেদীবাগ গোলপাহাড়ের মোড়ে আর আই টাওয়ারের গিয়ে দেখা যায় অফিস বন্ধ। ফলে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বেশ কয়েকজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন, ২০০৮ সাল নাগাদ খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণের ব্যবসায়ী শামসুল আলমের নেতৃত্বে এমইবি (মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স) গ্রুপের ব্যবসায় মন্দার ছোঁয়া লাগে। সেই সময়ে অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, অদক্ষতা, তেল ব্যবসায় লোকসান আর রাজনৈতিক মনোযোগের কারণে গ্রুপটি ঋণখেলাপি হয়ে যায় একাধিক ব্যাংকে। অপরদিকে তার ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব রিয়াদকে কৌশলে ভিন্ন নামে ব্যবসায় নিয়ে আসেন শামসুল আলম। তখন কিছু ব্যাংক সহযোগিতা করে। তবে কিছু ব্যাংক ঝুঁকি আছে বুঝতে পেরে অর্থায়ন থেকে বিরত থাকে। তবে যারা নাহার গ্রুপে অর্থায়ন করেছে, তারাও এখন বিপাকে পড়েছে।

চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমইবি গ্রুপের মূল ব্যবসা শামসুল আলমের বাবা মোহাম্মদ ইলিয়াছ তার ভাইকে নিয়ে শুরু করেন। পরে গ্রুপটির মালিকানায় আসেন দুই ভাইয়ের সন্তান। তাদের সন্তানদের মধ্যে ব্যবসায়িক মনোভাব ছিল কম। এছাড়া সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে গ্রুপটির কর্ণধার দুই ভাইয়ের সন্তানরা আলাদা হয়ে পড়েন। এ সময় ব্যবসায় হাল ধরার মতো যোগ্য উত্তরসূরি না থাকায় এমইবি গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়। তবে বিপুল পরিমাণে খেলাপি ঋণ পরিশোধে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। – শেয়ার বিজ

আরও পড়ুন

সর্বশেষ