একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১১ টি অভিযোগের মধ্যে আটটির প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ১, ৯ এবং ১০ নম্বর অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে গণহত্যাসহ বেশ কয়েকটি হত্যার অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার সাকার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা কালে এ কথা জানিয়েছে।
অভিযোগ-১ এ বলা হয়েছে, একাত্তরের ৪ বা ৫ এপ্রিল রাত আনুমাণিক ৯টার পর মতিলাল চৌধুরী, অরুণ চৌধুরী, যোগেশ চন্দ্র দে ও পরিতোষ দাস, পাচক সুনীল প্রমুখ বন্ধুরা একত্রিত হয়ে শহীদ মতিলাল চৌধুরীর চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালি থানার রামজন লেনের বাসভবনে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী আব্দুস সোবহান এ বাড়িতে ঢুকে তাদের দেখে সঙ্গে সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে গুডসহিলে খবর দেন। তার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই দুই ট্রাক পাকিস্তানি সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে সোবহান বাসাটি ঘেরাও করে ফেলেন এবং তাদের অপহরণ করে ট্রাকে তুলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবনে স্থাপিত নির্যাতন কেন্দ্র গুডসহিলে নিয়ে যান।
তাদের সঙ্গে পাচক সুনীলকেও আটক ও অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের ট্রাকে তুলে গুডসহিলে নিয়ে যান সোবহান। পাচক বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ হওয়ায় তাকে গুডসহিলের নির্যাতন কেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি ৬ জনকে আটক করা হয়। ছাড়া পাওয়ার কিছুক্ষণ পর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী আব্দুস সোবহান মতিলাল চৌধুরীর বাসার সামনে সুনীলকে দেখতে পেয়ে সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হওয়ায় প্রমাণ বিনষ্ট করার জন্য তালোয়ার দিয়ে কোপাতে শুরু করেন। কিন্তু অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে আটক করে রাখা সেই ৬ ব্যক্তির আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। যা থেকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায় যে, তাদের সেখানেই হত্যা করা হয়েছে।
মধ্য গহিরা গ্রামের গণহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগ-২ এ বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল এ সমস্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সকাল আনুমানিক সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার দখলদার সেনাবাহিনীর একদল সদস্য গহিরা গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। অভিযান চালিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দুদের ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে তাদের হত্যা করে। সেখানে যাদের গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে রয়েছেন, পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মা। আহতদের মধ্যে মাখন লাল শর্মা মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক জখম হয়ে ৩-৪ দিন পর মারা যান। জয়ন্ত কুমার শর্মা পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে কয়েক বছর পর মারা যান।
৩ নম্বর অভিযোগে বলা আছে,চট্টগ্রামের রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের নুতন চন্দ্র সিংহকে মন্দিরে প্রার্থনারত অবস্থায় ধরে নিয়ে নির্যাতন করে পাকিস্তান সেনারা। পরে সাকা চৌধুরী গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
৪ নম্বর অভিযোগে বলা আছে: মুক্তিযুদ্ধের সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন যখন নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখন সাকা চৌধুরীর সহযোগী আবু মাবুদসহ দুই ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্যগহিরার জগৎমল্ল পাড়ায় কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের জড়ো করে। শান্তি কমিটির সভা করার নামে সেখানে তাদের জড়ো করা হয়। শান্তি কমিটির সভায় যোগ দিলে যদি জীবন বাঁচে- এ আশায় তাঁরা তাতে যোগ দেন। লোক জড়ো হওয়ার পর বিষয়টি জানানো হয় সাকা চৌধুরীকে। কিছুক্ষণ পর সাকা চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির হন। এরপর সেনারা চালায় ব্রাশফায়ার। ঘটনাস্থলেই তেজেন্দ লাল নন্দী, সমির কান্তি চৌধুরী, কিরণ বিকাশ চৌধুরীসহ ৩২ জন নিহত হন। কয়েক দিন পর নিহতদের ওই বাড়ির উঠানেই গণকবর দেওয়া হয়। এ ছাড়া আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে।
৫ নম্বর অভিযোগে বলা আছে: একই দিন দুপুর ১টার দিকে রাউজানের সুলতানপুরের বণিকপাড়ায় সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে নেপাল চন্দ্র ধরসহ চারজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এলাকায় থাকবে কি থাকবে না, এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে রাউজানের উনসত্তরপাড়ায় ক্ষিতিশ চন্দ্র মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে ১৩ এপ্রিল ডাকা হয় শান্তি কমিটির সভা। এলাকার লোকজন সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সাকা চৌধুরীসহ পাকিস্তান বাহিনী সেখানে হাজির হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ব্রাশফায়ার করে। এতে চরণ পাল, মন্তোষ মালী, বাবুল মালীসহ ৭০ জনের বেশি ব্যক্তি নিহত হয়। এদের মধ্যে ৫০ জনের নাম জানা গেছে। হত্যার পর সেখানেই গণকবর দেওয়া হয় লাশ।
৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একই বছরের ১৪ এপ্রিল রাউজান পৌরসভা এলাকায় সতিশ চন্দ্র পালিতকে তাঁর বাড়িতে ঘরের মধ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর নিহত সতিশ চন্দ্রের পরিবারের সদস্যরা ভয়ে ভারতে চলে যায়।
৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে- একাত্তরের ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে পিতা-পুত্রকে হত্যা করা হয়। ৯ নম্বর অভিযোগে বলা হয়- মধ্য এপ্রিলে সাকা চৌধুরীর নির্দেশে রাউজান থানার কদুরখিল হিন্দুপাড়ার শান্তি দেবকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।
১০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে- রাউজানের ডাবুয়া গ্রামের মানিক ধরের বাড়িসহ ওই এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে লুটপাট চালানো হয়।
১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে- একাত্তরের ২২ এপ্রিল রাউজানের শাকপুরা গ্রামে ফয়েজ আহমেদ, আলাল আহমেদ, আহাম্মদ ছফা, নিকুঞ্জ শীলসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫২ জনকে শনাক্ত করা গেছে। পাকিস্তান বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে এলাকার লোকজন শাকপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। কিন্তু বর্বর সেনাবাহিনী সেখানে ব্রাশফায়ার চালায়। এতে ওইসব ব্যক্তি নিহত হয়। এ গণহত্যার পর অনেকে ভয়ে ভারতে চলে যায়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তাঁর পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে ওই হত্যাকাণ্ড চালানো হয় বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।



