শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
প্রচ্ছদইন্টারভিউবেকায়দায় বিএনপির ভারতপন্থীরা

বেকায়দায় বিএনপির ভারতপন্থীরা

ডেস্ক রিপোর্ট (বিডি সময় ২৪ ডটকম)

বাংলাদেশ প্রশ্নে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক ধরনের মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মেরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, বর্তমান মহাজোট সরকারের নীতি ও অবস্থানের প্রতি সমর্থন রয়েছে ভারত ও রাশিয়ার।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহী। তারা বাংলাদেশে সংঘাত দেখতে চায় না। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে অনাগ্রহী হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমঝোতা তৎপরতাকে সরকার ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। সংসদ ও সংসদের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার বিরুদ্ধে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সুসম্পর্ক বিদ্যমান বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ জাতিসংঘের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সমঝোতার সব প্রস্তাবের প্রতি বিএনপি ইতিবাচক সাড়া দিলেও সরকার একের পর এক তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে কোনো কূটনীতিক উদ্যোগই কাজে লাগছে না এবং সরকার তাদের কোনো কথাই শুনছে না বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বিএনপিকে জানানো হয়েছে। তারা বলছে, সরকার তার পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের নেপথ্যে ভারত ও রাশিয়ার সমর্থন রয়েছে।
সরকারের শেষ সময়ের এই মেরুকরণের আভাস ঢাকার কূটনৈতিক মহলের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এখন প্রধান ইস্যু। আর এ কারণে তাদের সমঝোতা উদ্যোগের তৎপরতাও অনেকটাই থেমে গেছে। অনেকের মতে কূটনীতিকরা আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
সূত্রমতে, বিএনপিতে কিছুদিন আগ পর্যন্ত রাখ-ঢাক রেখে ভারতের সমালোচনা করা হতো। বলা হতো মহাজোট সরকারের ব্যাপারে তাদের এত ‘স্টেক’ নেই, তারা নিরপেক্ষ থাকবে। সূত্রমতে, ভারতপন্থী বলে পরিচিত দু-একজন নেতা ঢাকার হাইকমিশনের কর্তাব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তিও দিতেন। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে দলটির সন্দেহের তীর এখন ভারতের দিকেই। বলা হচ্ছে, নেপথ্যে ভারতের সমর্থনের কারণেই সরকার অনমনীয় থাকতে পারছে। উপেক্ষা করতে পারছে জনমতকে। সব মিলিয়ে কৌশলগত কারণে ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হলেও তাদের কোনো আশ্বাসের ওপর বিএনপি আর নির্ভর করতে রাজি নয়। দলের অভ্যন্তরে আলোচনা, বিএনপির ভারত কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দলে ভারতপন্থী বলে পরিচিতরা কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এ অংশের নেতারা ‘ভারতকে বাদ দিয়ে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়’ এমন যুক্তি দিয়ে এতদিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছেন। ওই অংশের সমর্থনে খালেদা জিয়া ভারত সফরেও যান। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন বলা হচ্ছে, বিএনপি শত আশ্বাস দিলেও তুলনামূলক বিচারে ভারতের কাছে খালেদা জিয়ার চেয়ে শেখ হাসিনা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। কারও কারও মতে, কংগ্রেস সরকার শেখ হাসিনা সরকারকে অনেক বেশি স্বস্তিকর ও নিরাপদ মনে করে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা শেখ হাসিনাকেই সমর্থন করবে।
পক্ষান্তরে গত দু’বছরে মহাজোট সরকারের কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব অসন্তুষ্ট। ড. ইউনূস ইস্যু, সংলাপে অনাগ্রহ, সর্বশেষ রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র ক্রয় চুক্তির ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমঝোতা উদ্যোগও সরকার অগ্রাহ্য করেছে। এদিকে এসব দেশকে সন্তুষ্ট রাখতে শুরু থেকেই তাদের সব উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে আসছে বিএনপি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ড. ইউনূসের পক্ষে সব সময়ই দাঁড়িয়েছে। এমনকি আন্দোলন কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রেও কূটনীতিকদের মনোভাব বিবেচনায় রেখেছে বিএনপি। দেশটির বাংলাদেশস্থ দূতাবাসের কর্মকর্তারা যখন খুশি বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অত্যন্ত সদ্ভাব বজায় রেখে দলটি আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। আর এ কারণে আন্তর্জাতিক শক্তি বলয়ের হিসেবেও তারা স্বস্তিতে রয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, ভারতের সমর্থন নিয়ে একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগও পশ্চিমারা সমর্থন না করলে তা সমর্থনযোগ্য করা যাবে না। ফলে বিএনপি এখন পুরোপুরি পশ্চিমমুখী হয়ে রয়েছে।
সূত্র মতে, অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ইদানীং পশ্চিমা বিশ্বের কূটনীতিকরা ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার অবস্থানকেও যুক্ত করছেন। তারা বলছেন, ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ক্রয় চুক্তি ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক মেরুকরণ বিবেচনায় রাশিয়াও মহাজোট সরকারকে সমর্থন করছে। সব মিলিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যকার বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। বলা হচ্ছে, মনমোহন সিং ও হাসিনা বৈঠকের ফলাফলের ওপর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হবে। তার সমর্থন পাওয়া গেলে সরকার আরও হার্ডলাইনে যাবে। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বৈঠকের ফলাফলের ওপর কিছু নির্ভর করবে না। কারণ এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রভাবশালী এই দেশটির ‘সংকেতে’র ওপরই জাতিসংঘ তথা পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান নির্ভর করছে।
যদিও জঙ্গিবাদ ও ইসলামী মৌলবাদীদের দমনের কথা বলে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে- তবে গত প্রায় দু’বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশস্থ রাষ্ট্রদূতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না পাওয়া, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সরকারের বৈরী সম্পর্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং সর্বশেষ জন কেরির আলোচনা উদ্যোগে সরকার পক্ষের সাড়া না দেয়ার ঘটনা পেছনে ফেলে ওই সমর্থন আদায় অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ