চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন সফরে থাকা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সেখানে কী করছেন, সেই ব্যাপারে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। রোববার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন, ‘তারা (বিএনপি) ষড়যন্ত্রের চোরাবালি খুঁজছে। লন্ডনে তাঁরা (খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান) কী করছে, তার খোঁজখবর আমরা নিচ্ছি। সরকারি ও দলীয়ভাবে আমরা বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিচ্ছি। দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ওবায়দুল কাদের।
এ সময় আওয়ামী লীগের মনোনীত ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান সম্প্রতি ক্রসফায়ার নিয়ে গণমাধ্যমে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান দলের সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি সভায় শোকাবহ আগস্ট মাসের বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। গত ১৫ জুলাই সন্ধ্যার পর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। তাঁকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, তিনি (খালেদা জিয়া) চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। চিকিৎসাই একমাত্র উদ্দেশ্য। সেখানে যেহেতু আমাদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আছেন এবং তিনি আমাদের নেত্রীর সন্তান। সেখানে আলাপ-আলোচনা হবে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কিছু নেই।’
খন্দকার মোশাররফ সেদিন আরো বলেন, ‘অতি শিগগির খালেদা জিয়া চিকিৎসা শেষ করে দেশে ফিরে আসবেন। দেশে ফিরে এসে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেওয়ার কথা। তিনি ফিরে এসে সে রূপরেখা দেবেন। কিন্তু এর দুদিনের মাথায় সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মামলার ভয়ে একজন অনেক আগে থেকেই লন্ডনে আছেন। আর দলের শীর্ষ নেত্রী মামলার ভয়েই লন্ডনে টেমস নদীর পাড়ে চলে গেছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) আর ফিরে আসবেন কি না, এ নিয়ে চারদিকে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। সবার মধ্যে আলোচনা চলছে।’
সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান ক্রসফায়ার নিয়ে গণমাধ্যমে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে শোকজ করবে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সাভারের এমপি একটি পত্রিকায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে কথা উঠেছে। সেখানে তাঁর অসামঞ্জস্য বক্তব্য উঠে এসেছে। এটা সিরিয়াসলি খতিয়ে দেখছি। সেটা প্রমাণিত হলে শোকজ করব।
গত ১৮ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য এনামুর রহমান বলেন, ‘সাভারে অনেক ক্যাডার আর মাস্তান ছিল। এখন সব পানি হয়ে গেছে। কারো টুঁ শব্দ করার সাহস নেই। পাঁচজনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি, আরো ১৪ জনের লিস্ট করেছি। সব ঠান্ডা। লিস্ট করার পর যে দু-একজন ছিল, তারা আমার পা ধরে বলেছে, আমাকে জানে মাইরেন না, আমরা ভালো হয়ে যাব।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে সমালোচনা চলে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ক্রসফায়ারকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলেও উল্লেখ করেছে দেশি-বিদেশি বহু মানবাধিকার সংস্থা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারদলীয় একজন সাংসদের এমন মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে।
তবে ওই জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়া নিজের বক্তব্যকে অনভিপ্রেত, অশোভনীয় ও নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করে বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য এনামুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আমি যে বিষয়ে আলোকপাত করতে চেয়েছিলাম, তা যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে না পারায় বক্তব্যের রূপটি বিকৃত হয়ে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করেছে; যা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। এ বক্তব্যের জন্য আমি লজ্জিত, দুঃখিত। জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
ক্রসফায়ার সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্যকে একান্ত ব্যক্তিগত উল্লেখ করে এর সম্পূর্ণ দায় নিজের ওপরে নেন এনামুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে সরকার কিংবা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো সংশ্লিষ্টতা, এমনকি নীতিগত প্রতিফলন নেই। আমি আমার অবিবেচনাসুলভ বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। একই সঙ্গে এ ব্যাপারে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ারও অনুরোধ করছি।’
এক ছাত্রীকে ধর্ষণ, পরে তাঁকে ও তাঁর মাকে নির্যাতন করে মাথা মুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকারের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও। আজ সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি সাংবাদিকরা উত্থাপন করলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বগুড়ায় যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটা আমাদের সহযোগী সংগঠনের ব্যাপার। তাদের ব্যাপারে আমরা যেহেতু সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, তাই সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দ্রুত নির্দেশনা দেওয়া হবে।’
বগুড়ার এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর তুফান সরকার ও তাঁর তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। অন্যদিকে তুফান সরকারকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের আরো জানান, শোকাবহ আগস্টে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বন্যাদুর্গত এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করার নির্দেশও দেন তিনি। আগামীকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনে দলের হিসাব দেওয়া হবে জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস ধরে কাজ করে হিসাব সম্পন্ন করেছি। এই হিসাব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছি। আগামীকাল আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের কাছে জমা দেবো।’




