শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনআর কারো বুক যেন খালি না হয়

আর কারো বুক যেন খালি না হয়

‘সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি আর কোন শিপিং এজেন্ট যাতে ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ সাগরে ভাসাতে না পারে। এভানে জাহাজ ভাসিয়ে মানুষের জীনব নিয়ে যেন খেলা না করে। আর কারো বুক যেন খালি না হয়।‘

থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূলে দুর্ঘটনার কবলে পড়া এমভি হোপের চিফ অফিসার মাহবুব মোর্শেদের লাশ বুধবার সন্ধ্যায় বাড়িতে আনা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।

এসময় তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে হালিশহর কে ব্লকের দুই নম্বর সড়কের ৫ নম্বর লেইনের ২/এ বাড়ির আকাশ-বাতাস।

পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে মাহবুব সবার ছোট। বড় ভাইয়ের মৃত্যু হলেও বাকিরা বেঁচে আছেন।

বাড়ির সামনে লাশবাহী গাড়িতে হিমশীতল মাহবুব মোর্শেদের নিথর দেহ পড়ে থাকলেও থামছে না ভাই বোনদের কান্না। যদিও বাবা হারানোর ব্যথা অনুভব করতে পারছেন ছোট্ট দুই শিশু মায়েশা ও জাইমা।

বড় বোন রুনা লাইলা বলেন, আমরা জানি আমার ভাইকে আর ফিরে পাবো না। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ কেউ যেন আর সাগরে ভাসতে না পারে। আর কোন মায়ের, ভাই-বোনের বুক যেন খালি না হয়।’

যারা এ ধরণের জাহাজ সাগরে ভাসিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করেছে তাদের বিচার দাবি করেন তিনি।

মাহবুব মোর্শেদের স্ত্রী ইসমত জাহান স্বামীর স্মৃতির কথা বলতে গিয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কন্ঠে শুধু বললেন,‘শেষ কথায় বলেছিলাম তুমি ঠিক মতো খেয়ো, যত্ম নিয়ো।

জাহাজে ত্রুটি ছিল:

মাহবুব মোর্শেদের বড় ভাই মনিরুল আলম বলেন, ‘আমরা ভাবিনি কখনো জাহাজ মালিকরা এ ধরণের একটি জাহাজ সাগরে ভাসাবে। শিপিং এজেন্ট’র কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোন উত্তর দিতে পারেনি তারা।‘

তিনি বলেন,‘আমার ভাই জাহাজে উঠার পর থেকেই ফোন করলেই বলতো ভাইয়া আমার জন্য দোয়া করিও। জাহাজের কন্ডিশন ভালো না। আগে জানলে আমি এ জাহাজে উঠতাম না।‘

জাহাজটি খুব পুরনো ছিল অভিযোগ করে তিনি বলেন,‘মোর্শেদ প্রায় সময় বলতো। জাহাজটির ইঞ্জিন প্রায় সময় বন্ধ হয়ে যেতো। হয়তো দুর্ঘটনার কথা ভাইয়ের জানা হয়েছিল।‘

তিনি বলেন, আমার ভাই জাহাজে উঠতে চায়নি। তাকে ইরানের বন্দর থেকে জাহাজে তোলে।

বড় বোন রুনা লায়লা বলেন,‘জাহাজের মালিক পক্ষ জেনেই জীবন্ত মানুষগুলোকে মেরে ফেলেছে।‘

বাবা আনবে পুতুল আর চকলেট:

মাহবুব মোর্শেদের বড় মেয়ে মায়েশা। বয়স ৬ থেকে ৭ বছর। ছোট মেয়ে জাইমার বয়স এক বছর। স্বামীর শোকে মা ইসমত জাহান যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে। তখন তার কোলে বসেই হাসছিল। আর বাবা বাবা বলে ডাকছিল।

বাবার মৃত্যু শোক এখনো বুঝে উঠতে পারেনি মায়েশা। বাবার সঙ্গে কি কথা হয়েছিল জানতে চাইলে বললো,‘বাবাকে বলেছিলাম বড় একটা পুতুল, গাড়ি আর চকোলেট আনতে।

বাবা কি বলেছিল মনে আছে? উত্তরে মায়েশা বলে,‘বাবা বলেছিল তুই ভালো করে পড়িস। তোর জন্য সবই আনবো।‘

গত ৪ জুলাই গভীর রাতে থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূলে ঝড়ের কবলে পড়ে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি হোপ, জাহাজে থাকা ১৭ নাবিক প্রাণ বাঁচাতে সাগরে ঝাঁপ দেয়। এরমধ্যে নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া দুই নাবিকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এমভি বাক্সমুন নামের একটি জার্মান জাহাজে করে এদের পাঁচজন গত রোববার চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকক এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে (পিজি-৭৪৫) তিন নাবিক শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে  বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে উদ্ধার হওয়া দুই নাবিকের লাশ।

এমভি হোপের চিফ অফিসার মাহবুব মোর্শেদের বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহর কে ব্লকে। আর চিফ ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাইফুদ্দিনের লাশ মানিকগঞ্জ পাঠানো হয়।

মাহবুব মোর্শেদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার যোহরের নামাজের পর হালি শহর কে ব্লকের বায়তুল হাকিম জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম এবং এরপরই বন্দর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বন্দর কবরস্থানে দাফন করা হবে।

একই ঘটনায় এমভি হোপের নিখোঁজ ছয় নাবিকের এখনো কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানান পিঅ্যান্ডআই ক্লাবের প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের।

নিখোঁজ ছয় নাবিক হলেন, জাহাজের ক্যাপ্টেন রাজীব চন্দ্র কর্মকার, দ্বিতীয় প্রকৌশলী মো. নেজাম উদ্দিন, ইলেকট্রিশিয়ান সাদিম আলী, প্রধান কুক নাসির উদ্দিন, নাবিক নাসির উদ্দিন ও মো. আলী হোসেন ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ