কুখ্যাত রাজাকার সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকা) জন্মস্থান চট্টগ্রাম হওয়ায় এই জনপদের মানুষকে গত ৪৫ বছর ধরে ‘স্বাধীনতাবিরোধীর এলাকার’ অপবাদ বয়ে বেড়াতে হয়েছিল। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে সেই সাকা’র ফাঁসি হয়েছে। কলংমুক্ত হয়েছে বীর প্রসবিনী চট্টগ্রাম। আর সেই চট্টগ্রামের কলংকমুক্তির পর প্রথম বিজয় দিবসে চট্টগ্রামবাসীর উচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার দেখা গেছে শহীদ মিনারে। মহান বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঢল নেমেছে সর্বস্তরের মানুষের। স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে মানুষে ছুটেছে শহীদ মিনারের দিকে।
কারও হাতে ব্যানার, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কেউ নিয়েছেন পুষ্পস্তবক, কেউ বুকের কাছে ধরে রাখা একটি মাত্র গোলাপ। আবার কেউ নিয়েছেন স্বাধীন বাংলার লাল সবুজ পতাকা। সবাই যেন মিলেছেন এক মোহনায়। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের স্রোত যেন মিশে গেছে সেই একই মোহনায়। বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে নগরীর লাভ লেইন থেকে নন্দনকানন হয়ে টিএন্ডটি অফিসের সামনে দিয়ে সিনেমা প্যলেস পর্যন্ত এলাকা। নন্দনকানন বোস ব্রাদার্সের সামনে দিয়ে রাইফেল ক্লাবের পাশ হয়ে নিউমার্কেট পর্যন্ত এলাকায়ও ছিল মানুষের ঢল।
বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে মঙ্গলবার রাত ১২টা ০১ মিনিটে নন্দনকানন ফায়ার স্টেশন থেকে বেজে উঠে ঘণ্টা। শুরু হয় শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। নগর পুলিশের একটি চৌকস দল এএসআই ফরিদের নেতৃত্বে সশস্ত্র অভিবাদনের মধ্য দিয়ে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর মূল আয়োজন সঞ্চালনা করেন। শুরুতে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন কাউন্সিলরদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর মেয়রের নেতৃত্বে নগর আওয়ামী লীগ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ সালাম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো.আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো.আবদুল্লাহ, সিএমপি কমিশনার মোহা.আব্দুল জলিল মন্ডল এবং অতিরিক্ত কমিশনার একেএম শহীদুর রহমান ও দেবদাস ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো.শফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ ও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিটের নেতারা শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানানোর সময় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে।
প্রাক্তন মন্ত্রী ও সভাপতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ডা.শাহাদাৎ হোসেনের নেতৃত্বে নগর বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদল, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সভাপতি নূরুল আলম চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক এম এ সালামের নেতৃত্বে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় পার্টি চট্টগ্রাম মহানগর ও উত্তর জেলার নেতারাও শ্রদ্ধা জানাতে যান।
সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন খালেদ সেলিম এবং যুব মৈত্রীর সভাপতি শরীফ চৌহানের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, যুব মৈত্রী ও ছাত্র মৈত্রী রাজাকার-আলবদর এবং জামায়াতমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শ্লোগান দিয়ে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায়। এসময় তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের শ্লোগানও দেন। রেলওয়ে পুলিশ, আরআরএফ কমান্ড্যান্ট, শিল্প পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম রেঞ্জ পরিচালক এবং জেলা কমান্ডার, বন বিভাগ, বিআইডব্লিউটিসি, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে জাতির বীর সন্তানদের শ্রদ্ধা জানায়।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা পরিষদ, আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু ও যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদের নেতৃত্বে নগর যুবলীগ, চবি শিক্ষক ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমাণ্ড মহানগর শাখা, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী এটলির নেতৃত্বে নগর শ্রমিক লীগ, নগর ছাত্রলীগ, ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, ওলামা লীগ, সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ, হকার্স লীগের নেতারাও শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতিও শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। ন্যাপ, ঐক্য ন্যাপ, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা তপন দত্তের নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ কয়েক’শ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পুস্পস্তবক অর্পণের পুরোটা সময়ই শহীদ মিনারে আসা বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী, সাধারণ মানুষ শ্লোগানে শ্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে রাখেন। অধিকাংশ মানুষ এসময় বাকি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চেয়ে শ্লোগান দেন।




