সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
প্রচ্ছদদেশজুড়েঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাঠিয়াল বাহিনীর বখরায় যানজট

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাঠিয়াল বাহিনীর বখরায় যানজট

পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাত্রীবাহী পরিবহন ও ট্রাক থেকে দিনের আলোয় তোলা হচ্ছে বখরা (চাঁদা)। বখরা তুলছে একদল ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ (সবার হাতেই মোটা লাঠি)। আর বখর‍া তুলতে যাতে কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য চিটাগাং রোড থেকে কাচপুর ব্রিজ পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। সাংবাদিক-ক্যামেরা দেখলেই তারাই বনে যান ট্রাফিক! পুলিশ সেখানে নীরব দর্শক। তবে পুলিশ বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাচপুর ব্রিজের শেষ প্রান্তে (ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী) রাস্তার নির্মাণ কাজ চলার কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আর বিভিন্ন পরিবহন থেকে যারা বখরা তুলছেন তারা পুলিশের লোক না। এদের বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানে না। তাদের দাবি, কৃত্রিমভাবে যানজট সৃষ্টি করা হচ্ছে না। গাড়ির চাপেই যানজট।

এদিকে শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ যানজটের চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে মৌচাক থেকে কাচপুর ব্রিজ পর্যন্ত এবং তারাবো বিশ্ব রোড থেকে কাচপুর ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তায় সব ধরনের পরিবহন দীর্ঘক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। মৌচাক থেকে কাচপুর ব্রিজ পার হতে প্রতিটি পরিবহনের এক ঘণ্টার উপরে সময় লাগছে। অপরদিকে তারাবো বিশ্বরোড থেকে কাচপুর ব্রিজ পার হতেও সময় লাগছে প্রায় ঘণ্টা খানেক। যানজটের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, চিটাগাং রোড থেকে ব্রিজ চারটি পয়েন্টে লুঙ্গি-জামা পরিহিত একদল ব্যক্তি প্রায় প্রতিটি পরিবহন থেকেই ১০ থেকে ২০ টাকা বখরা তুলছেন। তাদের বখরা তোলার এ তৎপরতা  ক্যামেরায়ও ধরা পড়ে। তাদের থেকে কয়েক গজ দূরেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের।

এই দলের হাতের লাঠির ইশারায় পরিবহন থামিয়ে চলছে বখরা আদায়। অনেক সময় পরিবহনের ভিতরে ঢুকেও বখরা আদায় করা হচ্ছে। ম‍ূলত তাদের এ বখরা তোলার কারণেই সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। গণপরিবহনের চালকরাও যানজটের জন্য কাছে বখরা তোলাকে দায়ী করেন। তাদের (পরিবহন চালক) অভিযোগ, প্রতিদিন যতবার যাতায়াত করতে হয়, ততবারই ১০ থেকে ২০ টাকা বখরা দিতে হয়। যারা বখরা তোলে তাদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের যোগাযোগ আছে। বখরা না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।

হায়দার নামের এক ট্রাকচালক বলেন, তিনি ট্র্রাকে করে ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভিন্ন মালামাল বহন করেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে তারাবো বিশ্বরোড থেকে কাচপুর ব্রিজ এই পয়েন্টে প্রতিবার চাঁদা দিতে হয়। আবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে মৌচাক থেকে কাচপুর ব্রিজ- এই পয়েন্টেও চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। পুলিশও চাঁদাবাজদের সহায়তা করে, বলেন হায়দার।

একই ধরনের অভিযোগ করেন ঢাকা-আদমজি রুটে কোমল পরিবহনের চালক আলিম। তিনি বলেন, চিটাগাং রোড থেকে কাচপুর ব্রিজ রুটে পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা হয় এটি সবাই জানে। যারা চাঁদা তোলেন তারা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের লোক। পুলিশ সবই জানে। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না। কারণ পুলিশও আদায় করা চাঁদার ভাগ পায়।

আর এসব চাঁদা তুলতে যাতে কোন সমস্যা না হয় সে জন্য যানজট নিরসনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে যানজট সৃষ্টি করেন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুলিশ ও লাঠিয়াল বাহিনীর কার্যক্রম দেখেন তাহলেই সব আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে, বলেন আলিম।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চিটাগাং রোডে অবস্থিত ট্রাফিক পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পাওয়া যায় পুলিশ সদস্য বেনজিরকে। তিনি বলেন, আমি এখানকার ইনচার্জ না। তবে আপনারা যে যানজট দেখছেন তা মূলত সৃষ্টি হয়েছে রাস্তায় কাজ চলার কারণে। কাচপুর ব্রিজের শেষ প্রান্তে রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে। আপনারা গেলেই সে দৃশ্য দেখতে পাবেন। তাছাড়া সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এ রাস্তার যানজট স্বাভাবিক ঘটনা। চাঁদা তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, যারা চাঁদা তুলছে তারা আমাদের লোক না। আপনাদের কাছে কারা চাঁদা তুলছে তাদের ছবি আছে?

এ সময় ক্যামেরায় ধারণ করা চাঁদাবাজের ছবি দেখালে কন্ট্রোল রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক পুলিশ সদস্যকে চাঁদাবাজদের ধরে আনার নির্দেশ দেন তিনি। এরপর পুলিশ সদস্যদের তৎপরতাই কয়েক মিনিটের মধ্যেই যানজট কমে যেতে দেখা যায়। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে যারা চাঁদা তুলছিলো তাদেরও লঠি হাতে নিয়ে রাস্তা থেকে যানজট নিরসনে তৎপর হতে দেখা যায়। বাঁশি বাজিয়ে হাতের লাঠি দিয়ে পরিবহনে আঘাত করে তাদের যানজট নিরসনের চেষ্টাও লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

এদিকে কাচপুর ব্রিজে পার হয়ে দেখা যায়, অল্প একটু স্থানে রাস্তার সংস্কার কাজ চলছে। এতে পরিবহন চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও তা দীর্ঘ যানজটের কারণ নয়। এ স্থানটিতে গিয়েও লাঠি হাতে কিছু ব্যক্তিকে পরিবহন থেকে চাঁদা তুলতে দেখা যায়। এ সময় যানজট ও কাজের চিত্রের ছবি তুলতে গেলে ওই লাঠিয়াল বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা যানজট নিরসনে তৎপর হয়ে ওঠে। তাদের তৎপরতায় মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বেঁধে থাকা যানজটের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। ঘটনাস্থল ত্যাগ করার আধাঘণ্টা পর আবার যানজটের একই চিত্র দেখা যায়।

সোহেল নামের এক মুদি দোকানদার বলেন, যানজট ও পরিবহন থেকে চাঁদাবাজি এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। এটি সবাই জানে। যারা চাঁদা তোলে তাদের প্রতিদিনই লাঠি হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। কখনো লাঠির ইশারায় গাড়ি থামিয়ে চাঁদা তুলবেন। আবার কড়াকড়ি হলে তারাই হাতের লাঠি দিয়ে গাড়িতে আঘাত করে যানজট নিরসনের চেষ্টা করবেন। এরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের লোক।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ