অযাচিত মন্তব্যের জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে খেসারত দিতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, কেউ অবিবেচকের মতো কথা বললে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সে জন্য যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে আমি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এক্ষেত্রেও প্রক্রিয়া মানা হবে। শুক্রবার বিকেলে নিজের বাসভবন গণভবনে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সংবিধান মেনে, কার্যবিধি মোতাবেক লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেবো, তা না মানলে তাকে অপসারণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তও প্রয়োজন হবে। আপনারা জানেন রাষ্ট্রপতি হজে রয়েছেন। তিনি ফিরলেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। তবে আমি ফাইল প্রস্তুত রাখতে বলেছি, যাতে রাষ্ট্রপতি দেশে ফিরলেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, অযাচিত মন্তব্যে সরকারের বেকায়দায় পড়ার প্রশ্নই আসে না। লতিফ সিদ্দিকী নিজে বেকায়দায় পড়েছেন। এর দায় তার। প্রধানমন্ত্রী এও মনে করেন এই মন্তব্যে আওয়ামী লীগও বেকায়দায় পড়েনি। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। দলের কার্যনির্বাহী সভায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, আশা করি আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই এর বিরোধীতা করবেন না।
যিনি কথা বলেছেন বিপদ তারই, আওয়ামী লীগেরও বিপদ নেই, সরকারের বিপদ নেই, দেশের মানুষেরও বিপদ নেই, এটুকু নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি, বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, আমরা একটি ধর্মে বিশ্বাস করি। এই ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। আর সে কারণেই আমি এই ঘোষণা দিয়েছি। যথা সময়ে সেটা কার্যকর করা হবে। যেটা আমরা বলেছি সেটা করা হবে। এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু করার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হয়েছে, ফলে আমরাই ব্যবস্থা নেবো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিউইয়র্ক থেকে প্লেনে উঠে এই কথা শুনেছি, সেখান থেকে লন্ডনে পৌঁছেই বলে দিয়েছি এই ঘটনায় ব্যবস্থা নিতেই হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিতে এতটুকু দেরী করিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে এবং নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে আমাদের সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন বিশ্ব নেতারা। একইসঙ্গে তারা আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নেরও প্রশংসা করেছেন।বিনিয়োগবান্ধব দেশ গড়তে উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, এবার জাতিসংঘে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। এমডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এসব সাফল্য অর্জনে জাতিসংঘে বাংলাদেশে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়ে চলেছে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যখন ১৯৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় ছিলাম তখনও বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এলে সে ধারাবাহিকতা কমে যায়। এবারও ক্ষমতায় এসে আমরা দারিদ্র্য হার কমিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি, শিক্ষার হার বাড়াতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়েছি। আমরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছি দেশকে। তিনি বলেন, আমরা আগে যে কাজ শুরু করেছিলাম তা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো এমনটি ভাবিনি, এটাই আমাদের সব চেয়ে বড় পাওয়া। তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে সে সুযোগ পেলাম। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, প্রত্যেক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে থাকে। সবার মতো আমারও ঝুঁকি থাকতে পারে। খুনিরা এই মাটিতে আমার মা, বাবা, ভাই, এমনিক ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলকেও ছেড়ে দেয়নি। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই আমি এসেছি। আমি কোনো ঝুঁকির পরোয়া করি না। ঝুঁকি নিয়ে চিন্তাও করি না। এদেশের মানুষের জন্য আমার বাবা সব কিছু ত্যাগ করেছেন। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা বাবার স্বপ্ন ছিল। বাবার স্বপ্নের বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সেভাবে গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব রোল মডেল হিসেবে পুরস্কার পাচ্ছে। কে কী বললো তাতে কিছু আসে যায় না। হয়তো কিছু উচ্চ শ্রেণী ভুল করতে পারে, সাধারণ মানুষ নয়। আমি তাদের ওপরই ভরসা করি, তাদের কথা ভেবেই চলি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন আগ্রহ দেখালাম তখন কোনো খবর ছিল না। এখন কার সঙ্গে আলোচনা করবো?
তিনি বলেন, বিশ্বদরবারে এখন আর কোনো রাজনৈতিক সমস্যার কথা কেউ বলছে না। তাছাড়া, কোনো খুনির সঙ্গে আলোচনা করা যায় না। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে কীসের আলোচনা। যদি দেশের স্বার্থে আমরা সে চেষ্টাও একসময় করেছি। আসলে এতটা রাজনৈতিক দৈন্যতায় বাংলাদেশের মানুষ কখনো পড়েনি।
শেখ হাসিনা জানান, দেশের ৬৪ ভাগ মানুষ এখন বিদ্যুৎ পায়, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেবো, কিন্তু অপচয় যেন না হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বন্দি বিনিময় নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে চলছিল? তবে ৯৬ সালে আ.লীগ ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার চেতনার পতাকা উন্মোচিত করে তিনি বলেন, আমি অতো লেখা পড়া জানি না। এটা বুঝি গরীব মানুষ ভাত খাবে, বেকারত্ব দূর হবে। দেশ বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে চলবে।
বিএনপি জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের হুমকি শুনেই যাচ্ছি। মানুষ খুন করতে শুরু করলে দেশবাসী নিয়েও প্রতিহত করতে হবে। অনেক কিছু বলা হয়েছিল, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে নাকি গৃহযুদ্ধে শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু হয়নি। দেশের মানুষ তাদের সেই দাবি গ্রহণ করেনি। কিন্তু মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো কত জঘণ্য কাজ তারা করেছে। কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে লাভ নেই মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, কঠোর আন্দোলন দেখার মতো ক্ষমতা সরকারের আছে।
ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে যা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে যাচ্ছে। আমাদের মন্ত্রী (এ কে খন্দকার) যেটা লিখেছেন, সেটা প্রকাশকরা কীভাবে প্রকাশ করেন। তাছাড়া, দু‘টি বইয়ের লেখা একজনের বলেই মনে হয়। আরেকজন মুচলেকা দিয়ে বিদেশে বসে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা করছেন, দেশবাসী তাকে চেনেন। অপকর্ম করে বিকৃত কথা বলে যাচ্ছে। সত্যিকারের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যান প্রধানমন্ত্রী। ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন তিনি। জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া, জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি-মুন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। ব্যস্ততম যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ২৯ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন তিনি। যুক্তরাজ্যে দু’দিনের ব্যক্তিগত সফর শেষে ১ অক্টোবর বুধবার লন্ডন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে উড়াল দেন প্রধানমন্ত্রী। ২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকালে দেশে ফেরেন তিনি।
পবিত্র হজ, মোহাম্মদ (স.), তাবলীগ জামায়াত, প্রবাসীদের রাজনৈতিক উদ্যম ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে লতিফ সিদ্দিকীর অযাচিত মন্তব্যে এরই মধ্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। ধর্মীয় অনভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা ও এসব মামলায় সমনও জারি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এ বিষয়ে দেশে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, কেবল মন্ত্রিসভা থেকে নয়, এমন মন্তব্যের কারণে ঈদের পর লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হবে।




