শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬
প্রচ্ছদজাতীয়বিএনপির সংঘাত, হরতালের রাজনীতি না করার প্রতিশ্রুতি

বিএনপির সংঘাত, হরতালের রাজনীতি না করার প্রতিশ্রুতি

ষ্টাফ  রিপোর্টার  (বিডিসময়২৪ডটকম)

সভা-সমাবেশ করতে দিলে বিএনপি সংঘাত, হরতালের রাজনীতি বন্ধ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। মওদুদ আহমদ বলেন, বিএনপির বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো তুলে নিন, দেশের রাজনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার প্রয়োজন আছে বলেও তিনি মত দেন। শনিবার ব্র্যাক সেন্টার-ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) উদ্যোগে ‘রাজনৈতিক দলসমূহ এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি একথা বলেন।

মওদুদ আহমদ বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সমস্যা। আমরা যারা গণতন্ত্রের কথা বলি তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি কি-না?  দেশে এখন গণতন্ত্র নেই, রাজনীতিও নেই। তাই গণতন্ত্রকে এখন ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশে বিরাট শূন্যতা বিরাজ করছে। এর পরিণতি ভালো হবে না। যদি এভাবে চলতে থাকে সমাজে দেখা দেবে নৈরাজ্য, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে, মৌলবাদের উত্থান ঘটবে। সামাজিক সমস্যা আরো বাড়বে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা কেবল শুরু। যদি গণতন্ত্র না ফিরে আসে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মওদুদ বলেন, একেক দেশের রাজনীতি একেকভাবে তৈরি হয়েছে মূলত নেতৃত্বের কারণে। নেতৃত্বের পার্থক্যের কারণে একেক দেশ একেকভাবে উন্নতি করেছে। আমার নিজের দলসহ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সফল হতে পারেন নাই। আওয়ামী লীগের এক দলীয় শাসন না এলে সামরিক শাসন আসতো না। দুই নেত্রীরই জনপ্রিয়তা আছে, কোটি কোটি অনুসারী রয়েছেন।

মওদুদ আহমদ বলেন, গণতন্ত্রের চর্চা করতে আমরা রাজি আছি কি-না, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা তৈরি করতে চাই কি-না, ত্যাগ স্বীকার করতে চাই কি-না- এসবের ওপরেই নির্ভর করছে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। নাহলে দু’টি দল থাকতো না। অনৈতিকতা ও মিথ্যাচার জাতীয় রাজনীতিতে অনেক আগেই চলে এসেছে। তোফায়েল আহমেদের মতো রাজনীতিবিদ আওয়ামী লীগে আগামী ১০ বছরে থাকবেন কি-না সন্দেহ রয়েছে। মন্ত্রী বা এমপি হলেই কি রাজনীতিবিদ হয়ে যাবেন? এজন্য একটি সংজ্ঞা চাই।

পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সেমিনারে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাধ্যবাধকতার কারণে এটি রাখা সম্ভব হয়নি। আর এক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষে গেলে তারা বলতো, আইনের শাসন মানা হচ্ছে না।

ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ যখন একথা বলছিলেন তখন তার একটি আসন পরেই বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ উপবিষ্ট ছিলেন। মওদুদ আহমদ এ সময় মুচকি হাসলেও তোফায়েল আহমেদ চুপচাপ বসেছিলেন।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। অথচ এটি নিয়ে কেউ জোরালোভাবে কথা বলেন না। দলের প্রধানের ওপর নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব না দিয়ে প্রত্যেকটি পদে নির্বাচনের প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তাহলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. রওনক জাহান সেমিনারে বলেন, গণতন্ত্র চাইলে দলের ভেতরে-বাইরে গণতন্ত্রের চর্চা হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

মূল বিষয়ের ওপর প্রবন্ধে ড. রওনক জাহান বলেন, উত্তরাধিকারের ধারা শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই নয়, জামায়াত ও জাতীয় পার্টিতেও রয়েছে। যে কারণে পরিবারের বাইরে থাকা নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা বিরাজ তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সংসদে শেখ হাসিনার ৭ জন আত্মীয় সদস্য রয়েছেন। একই ধারায় খালেদা জিয়া ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আত্মীয়রাও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. শামসুল হুদা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজ দায়িত্বে কিছু করে না এবং করবেও না। বাইরে থেকে চাপ তৈরি করে তা করাতে হবে। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য নিয়মিতভাবে নির্বাচন হতে হবে এবং তা অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে কিছুই হবে না। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। এগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে না পারলে দেশে পিছিয়ে যাবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমশের মবিন চৌধুরী বলেন, উত্তরাধিকারের রাজনীতি অবৈধ নয়। নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃতপক্ষে কিভাবে শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।

সাবেক এমপি আকরাম হোসেন নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাসী নূর হোসেনের আওয়ামী লীগে যোগদান প্রসঙ্গে বলেন, ওই সময় একজন এমপি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, ‘আপা একটা বড় রুই নিয়ে এসেছি। ও বিএনপিতে খুবই সক্রিয় ছিল’। এটি বলার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাহবাও পেয়েছিলেন ওই এমপি।

বিএনপি চেয়ারপাসরনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দিন শেষে জনগণের মধ্য থেকেই ঐকমত্য আসতে হবে। এজন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। দুর্নীতির তালিকায় যারা শীর্ষস্থানে রয়েছেন, তাদের অধিকাংশই রাজনীতিক। সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পদ্ধতিগত কাজ করতে হবে। না হলে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হবে না।

রওনক জাহান বলেন, দলের তহবিল সংগ্রহের কারণেই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক নারায়ণগঞ্জের ঘটনাই তার প্রমাণ। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। কারণ আদর্শিক কারণে এটি হয় না। অর্থের কারণেই হয়ে থাকে।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ভেতরেও বেশিরভাগ লোক তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি রাখার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন, প্রধানমন্ত্রী এটি না রাখার পক্ষে, তখন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বিলোপের পক্ষে অবস্থান নিলেন তরাও। এ থেকে বোঝা যায়, দলের প্রধানের বিরুদ্ধে কেউ যেতে পারেন না।

রওনক জাহান বলেন, প্রশাসন ও সরকারি দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না। এজন্য রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। অর্থনৈতিক নীতিতে সবগুলো দলের মধ্যে একটি ঐক্য রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েই দ্বন্দ্ব। সব দলের কাঠামো একই ধরনের।

তিনি বলেন, পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন দলে একই পরিবারের রাজনীতিকও পাওয়া যায়। রাশেদ খান মেনন ও সেলিমা রহমান ভাই-বোন হওয়া সত্ত্বেও দু’জন দুই দলে। কৌশলগত কারণে পরিবার রক্ষার স্বার্থেই এগুলো করা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দলের বাইরে গিয়ে অনেকেই সুবিধা করতে পারছেন না। কারণ, দলের প্রতীক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দলের ভেতরে থেকেই অনেকে গ্রুপিং করছেন। তাই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ছে। দলগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দল গঠন থেকে বের হয়ে আসা, সংসদ বর্জন পরিহার, সরকার ও দলের মধ্যে পার্থক্য রাখা, দলের ভেতর থেকে সমালোচনার জায়গা তৈরি করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ সেমিনারে বলেন, ট্র্যাজেডিকে বারবার ব্যবহার করা যায় না। বেনজীর ভুট্টোর স্বামী তার নিহত হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু বারবার এটি ব্যবহার করা যায় না। যেমন, ভারতে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক কোনো ট্র্যাজেডি নেই। যে কারণে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। তিনি বলেন, যারা বড় বড় নেতা হয়েছেন, তারা কেউই রাজনৈতিক পরিবারের কেউ না। এতো বড় বড় নেতা যখন পরিবারের বাইরে থেকে হয়েছেন, তাহলে এখন কেন সম্ভব নয়?

সুশাসনের জন্য পারিবারিক রাজনীতি ক্ষতিকারক বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, সব দল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা উচিত। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে নেক্সাস বন্ধ না হলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে না। কারণ, এই তিন শক্তির মধ্যে সেনাবাহিনী যার পক্ষে থাকে, তারাই ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে এটি বন্ধ হতে হবে।

এছাড়াও অধ্যাপক রেহমান সোবহান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন, সাবেক মন্ত্রী সাইদুজ্জামান, শিরিন আক্তার এমপি, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বিএনপি নেতা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সাংবাদিক মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, মুনীরা খান সেমিনারে বক্তব্য রাখেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ