চট্টগ্রাম অফিস (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
পুরনো বছরের সঙ্গে অতীতের জীর্ণতা, কালিমা হারিয়ে গেছে মহাকালের অতল গহ্বরে। সোমবার ভোরে উদিত নতুন সূর্য জানিয়ে দিয়েছে শুরু হয়েছে নতুন বছর। বাঙালির নববর্ষ, নতুন আবাহনের দিন। অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব।
নতুনের আবাহনে, নতুনের যাত্রায় এক হতে সোমবার ভোর থেকে রাস্তায় নেমেছে চট্টগ্রামের মানুষ। গান-নাচ, হাসি-আনন্দে নতুন বছরের মঙ্গলযাত্রায় শামিল হয়েছেন চট্টগ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু সবাই। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর যাত্রার মধ্য দিয়ে বাঙালী তার আবহমান চেতনার কথা আরেকবার প্রমাণ করেছে পহেলা বৈশাখে।
চিরায়ত বাঙালী ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখে প্রতিবছরের মতো এবারও নগরীর ডিসি হিল এবং সিআরবি শিরিষতলায় শুরু হয়েছে বড় দু’টি আয়োজন। নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’টি প্রাঙ্গনে শুরু হয়েছে গান, নাচ, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা।
একইসঙ্গে শুরু হয়েছে মানুষের ভিড়ও। বাবা-মায়ের হাত ধরে ছেলে-মেয়ে, বন্ধুর হাত ধরে বন্ধু, সহকর্মীরা উল্লাস নিয়ে কিংবা নতুন বর লজ্জারাঙা নববধূকে নিয়ে ছুটছে সেই সম্মিলনে। সেই পথচলা জানান দিচ্ছে-আজ দিন শুধুই বাঙালীর, যতদিন বাঙালী বেঁচে থাকবে, ততদিন তার সংস্কৃতিও মাথা উঁচু করে থাকবে।
নগরীর ডিসি হিলে সকাল ৭টায় রাগসঙ্গীত এবং ঢোলবাদ্যের মধ্য দিয়ে বর্ষবরণের মূল আয়োজন শুরু হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দলীয় সঙ্গীত, বৃন্দ আবৃত্তি, দলীয় নৃত্য পরিবেশিত হচ্ছে। দিনভর বর্ষবরণের এ আয়োজন করেছে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ।
ডিসি হিলের বাইরে রাস্তায় বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে বসেছে বৈশাখী মেলা। সেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার, শিশুদের খেলনাসহ গ্রামীণ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।
অন্যদিকে সকাল সাড়ে ৭টায় সিআরবি শিরিষতলায় নববর্ষ উদযাপন পরিষদের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয় মিহির কানুনগোর সেতার বাদনের মধ্য দিয়ে। এরপর একে এক উদীচী, রক্তকরবী, সংগীত পরিষদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা উপভোগ করছে হাজারো মানুষ। সিআরবিতে বিকেল ৩টায় সাহাব উদ্দিনের বলী খেলা এবং দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। সঙ্গীত, নৃত্য, আদিবাসী ঐতিহ্য উপস্থাপন, ফ্যাশন শো, মুকাভিনয়, ঐতিহ্যবাহী বলীখেলা, লাঠিখেলা, কাবাডি, বউচি খেলা, পুতুলনাচ, গ্রামীণ মেলাসহ নানা আয়োজনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পালন করছে নববর্ষ।
শিল্পকলা একাডেমিতে শিক্ষার্থীদের সমবেত সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সকাল ৮টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রভাতী অধিবেশ শুরু হয়। সেখানে বৃন্দ আবৃত্তি, গান, নাচসহ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ‘মেতে উঠি উৎসবে বৈশাখী আনন্দে’ স্লোগানে ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
ফয়’স লেকের কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্কে নববর্ষের সকাল থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় শুরু হয়েছে। সেখানে বিকেল তিনটায় রয়েছে বৈশাখী কনসার্ট। এতে গান করবে ব্যান্ডদল সোলস, প্রমিথিউস, রঙ, কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর, পাওয়ার ভয়েসের বেলী ও আনিকা। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় থাকবেন মীরাক্কেলের জামিল। এ ছাড়া ওয়াটার পার্ক সি-ওয়ার্ল্ডে দিনব্যাপী চলছে ডিজে শো।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সোমবার ভোর থেকে মানুষের ভিড় শুরু হয়েছে। সূচনা ক্রিয়েশন অ্যান্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন সেখানে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বাটালী রোডের রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি স্কুল মাঠে নববর্ষ বরণের আয়োজন করেছে। সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। এ উৎসবের উদ্বোধন করেন।
এদিকে নগরীর লালদিঘী ময়দানে সকাল ৭ টায় ছন্দানন্দ সঙ্গীত একাডেমী উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। বাংলা বর্ষবিদায় ও বরণ সম্মিলন পরিষদের উদ্যোগে মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। নববর্ষ আবাহনের মাধ্যমে শুরু হওয়া আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করবেন সুমা রায়। থাকবে বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আটর্সের দলীয় নৃত্য। লালনগীতি করবেন রোখসানা রূপসা ও কুষ্টিয়ার শেখ হেমায়েত।
এছাড়া নগরজুড়ে সরকারীভাবে কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে শোভাযাত্রা, চিরায়ত গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন সংস্কৃতি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ, আবৃত্তি, জাদু প্রদর্শনী, বলিখেলা, গুণীজন সম্মাননা, মূকাভিনয়, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ বর্ষবরণের জন্য বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধাপরাধী, মৌলবাদীসহ দেশ থেকে সকল অশুভ শক্তি দূর করার গড়ার প্রত্যয় নিয়ে চট্টগ্রামে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করেছেন। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নগরীতে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ডিসি হিলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মনজুর মোর্শেদ জানান, পুরো ডিসি হিল ঘিরে পুলিশ প্রহরা আছে। জনসমাগমের ভেতরেও সাদা পোশাকে পুলিশ, বিস্ফোরক নিস্ক্রিয়করণ দল এবং গোয়েন্দা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
সিআরবিতে দায়িত্বে থাকা নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মো.শহীদুল্লাহ বলেন, আমরা তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছি। খুব সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান চলছে।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের দায়িত্বে থাকা নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মোস্তাক আহমেদ বলেন, সমুদ্রসৈকতে ভোর থেকেই লোকজন আসতে শুরু করেছেন। সৈকত ঘিরে দেড় শতাধিক পুলিশ মোতায়েন আছে। ট্রাফিক বিভাগের টিমও আমাদের সঙ্গে কাজ করছে।




