বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
প্রচ্ছদচট্রগ্রাম প্রতিদিনপ্রধানমন্ত্রী ও হেফাজত আমিরের সাক্ষাৎকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক...

প্রধানমন্ত্রী ও হেফাজত আমিরের সাক্ষাৎকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম চট্টগ্রাম সফরে এসে ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর ২টায় অনুষ্ঠেয় এই মতবিনিময়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের প্রায় ১০০ জন আলেম অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে তাঁদের অনেকে বাবুনগর মাদ্রাসায় উপস্থিত হতে শুরু করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ও হেফাজত আমিরের এই সাক্ষাৎকে ঘিরে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হেফাজতের দীর্ঘদিনের জামায়াতবিরোধী অবস্থান, বিএনপির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে এই বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈঠকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়ন, হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা চালু রাখা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বাবুনগর মাদ্রাসায় এরই মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০০ জন আলেম মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে আসছেন। ইতোমধ্যে অনেক আলেম মাদ্রাসায় পৌঁছাতে শুরু করেছেন। তাঁদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হবে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সভাস্থল প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা সকাল থেকেই এলাকায় অবস্থান করছেন।

চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে রোববার দুপুরে হেলিকপ্টারে ফটিকছড়ির পেলাগাজীর দিঘি সিঅ্যান্ডবি মাঠে অবতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে নাজিরহাটের বাবুনগর এলাকায় আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন তিনি।

সেখানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে হেফাজত আমিরের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতিতে প্রায় ১০০ জন আলেমের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও সাবেক আমির আল্লামা মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করার কর্মসূচিও রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রথমত, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে হেফাজতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।

দ্বিতীয়ত, হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর একটি বড় অংশ এরই মধ্যে প্রত্যাহার হয়েছে। তবে এখনো যেসব মামলা বহাল রয়েছে, সেগুলোও প্রত্যাহারের দাবি জানাবে সংগঠনটি।

বিশেষ করে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের আন্দোলন ও পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনায় হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জোরালোভাবে আসতে পারে।

তৃতীয়ত, স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা রাখা। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বজায় রাখা এবং স্কুল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষা বহাল রাখার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবে হেফাজত।

চতুর্থত, হিজবুত তাওহিদ নিষিদ্ধ করা। বাংলাদেশে হিজবুত তাওহিদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিও মতবিনিময়ে উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ও পরিচালনা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আলেম সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজতের ১০০ আলেমের মতবিনিময়ে সংগঠনটির প্রভাবশালী নেতা আল্লামা মামুনুল হক থাকছেন না। নির্বাচনের সময় জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়াকে কেন্দ্র করে হেফাজতের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। হেফাজতের অভ্যন্তরে জামায়াতবিরোধী অবস্থান জোরালো হওয়ার পর সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাঁর সক্রিয়তা কমে যায়। ফলে প্রধানমন্ত্রী ও হেফাজতের এই গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময়ে মামুনুল হকের অনুপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে আদর্শিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। দেওবন্দি ধারার হেফাজত মওদুদী আদর্শের জামায়াতের বিরোধিতা করে আসছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রকাশ্যে বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

নির্বাচনের পরও সেই অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং জামায়াতের নির্বাচনী জোটে যাওয়া হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে সংগঠনের কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজতের আমির ও ১০০ আলেমের বৈঠককে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল। জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর নজরও তাই বাবুনগরের এই বৈঠকের দিকে।

তবে বৈঠকের বিরোধিতা না করে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে চট্টগ্রাম নগর জামায়াত। এক বার্তায় নগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রামে স্বাগতম-২। হেফাজতে ইসলামের বর্তমান প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সাবেক দুই প্রধানের কবর জিয়ারতকে ‘ভালো উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

একই সঙ্গে চট্টগ্রামের সব মানহাজ ও মারকাজের মুরব্বিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও মিলিত হতে পারতেন বলে মন্তব্য করেন নজরুল ইসলাম। তাঁর মতে, এতে চট্টগ্রামের দ্বীনি মুরব্বিদের মধ্যে মুহব্বত বাড়ত এবং ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনি ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি হতো।

তিনি পটিয়া, জিরি, নানুপুর, দারুল মাআরিফ, লালখানবাজারসহ দেওবন্দি ধারার মুরব্বি; দারুল উলুম, বায়তুশ শরফ, গারাঙ্গিয়া, চুনতিসহ আলিয়া ধারার মুরব্বি; জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়াসহ আলা হজরত রহমাতুল্লাহি আলাইহির অনুসারী মুরব্বি; আহলে হাদিস বা সালাফি মানহাজ এবং অন্যান্য মানহাজ ও মারকাজের মুরব্বিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের আহ্বান জানান।

এ ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের প্রত্যাশা জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকার সকলের।

বাবুনগর মাদ্রাসায় বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও সাবেক আমির আল্লামা মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করবেন প্রধানমন্ত্রী।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির। তিনি ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মারা যান। তাঁর পর হেফাজতের দ্বিতীয় আমিরের দায়িত্ব পালন করেন আল্লামা মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট মারা যান।

বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের তৃতীয় আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। নগর জামায়াতের আমিরও প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচিকে ভালো উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে তিন আমিরের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি ফটিকছড়ির উন্নয়ন নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরার প্রস্তুতি রয়েছে। ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর জানিয়েছেন, সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা, কয়েকটি কলেজ সরকারীকরণ, স্থানীয় গ্যাসসম্পদের সুষম বণ্টন, চা ও রাবারবাগানে শিল্পভিত্তিক গ্যাস সংযোগ এবং অব্যবহৃত খাসজমিতে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিষয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হবে।

ফলে বাবুনগরের মতবিনিময় সভায় ধর্মীয় দাবি, পুরোনো মামলা, শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি ফটিকছড়ির উন্নয়নও আলোচনায় আসতে পারে।

সব মিলিয়ে বাবুনগরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে হেফাজতের ১০০ আলেমের মতবিনিময় এখন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত কর্মসূচি।

হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়ন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা বহাল রাখা এবং হিজবুত তাওহিদ নিষিদ্ধ করার দাবিগুলো বৈঠকে কতটা গুরুত্ব পায়—সেদিকেই এখন নজর।

একই সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে বৈঠককে স্বাগত জানিয়ে চট্টগ্রামের সব মানহাজ ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের আহ্বানও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তাই বাবুনগরে প্রধানমন্ত্রী ও হেফাজতের এই মতবিনিময় শুধু সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর মধ্য দিয়ে সরকার ও হেফাজতের সম্পর্কের নতুন কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমীকরণের সূচনা হবে-বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও হেফাজতের প্রতিক্রিয়াতেই তার অনেকটাই স্পষ্ট হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ