নিজেকে একটি ক্ষুদ্র শহীদ পরিবারের সন্তান দাবি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছিলেন, আমাদের পরিবার কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে তাদের সঙ্গে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।’
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর আনীত জনগুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
অধিবেশনের আলোচনার শুরুতে জামায়াত আমির স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বলেন, ‘আপনি একজন গর্বিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীর বিক্রম। আমিও ক্ষুদ্র একটি শহীদ পরিবারের সন্তান। সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছিলেন, আমাদের পরিবার কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে তাদের সঙ্গে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ আমাদের সকলের।’
তিনি বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে কেউ না কেউ এ দেশের শাসনভার পরিচালনা করবেন, এটিই স্বাভাবিক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশপরম্পরায় শাসনের অবস্থাও থাকে না। সেখানে জনগণের ভোটে গঠিত সরকার দেশ পরিচালনা করে। দুঃখের বিষয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে।
দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে যারা সুযোগ পেয়েছিলেন, তারাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোনো মূল্যায়ন ছিল না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৪) কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচণ্ড দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে।’
এ সময় তিনি গুম-খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনো আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি। এছাড়া রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, ‘(আওয়ামী লীগের) এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে। এই জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়—কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুর—সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।
আলোচ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপরে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘এই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।
বক্তব্যের শেষে তিনি বিরোধী দল ও সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের এই গুরুত্বপূর্ণ সনদের ওপর উন্মুক্ত ও যৌক্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান এবং বিরোধী দলের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি অনুরোধ রাখেন।




