বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৬
প্রচ্ছদরাজনীতিনতুন বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা করেছে এনসিপি

নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা করেছে এনসিপি

নতুন সংবিধান প্রণয়ন, সেকেন্ড রিপাবলিক গঠন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচারের প্রতিশ্রুতি রেখে ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’ ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শেখ হাসিনার সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার এক বছর পূর্তিতে রোববার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশে ২৪ দফার এ ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন বাস্তবতায় সরকার পতনের সেই এক দফা এবার ২৪ দফায় রূপান্তরিত হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে এই শহীদ মিনারেই আমরা শপথ নিয়েছিলাম এই দেশকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করব। আপনারা সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিবাদী শাসনকে পরাজিত করেছি এবং দেশের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে এনেছি।

তবে পুরোনো বন্দোবস্তের পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন সংবিধান তৈরি করতে পারিনি; ক্ষমতার দুর্নীতিপরায়ণ স্তম্ভ ও সামরিক-প্রশাসনিক কাঠামো ভাঙতে পারিনি। আজ আমরা নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করতেই এখানে এসেছি।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ১৯৭২ সালের মুজিববাদী সংবিধান ও তৎপরবর্তী বাকশালি অপশাসন, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ ছিল মানুষের এই সুদীর্ঘ ত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিষ্ঠুর প্রতারণা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি একমুখী ও স্বেচ্ছাচারী মতবাদ। তারপর রাষ্ট্র গঠনের নানা চড়াই-উতরাই পেরোলেও স্বাধীনতার পাঁচ দশকে এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারিনি; যা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

এরপর এনসিপির ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন নাহিদ ইসলাম। এতে প্রথম অঙ্গীকার হিসেবে গণপরিষদের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী সেকেন্ড রিপাবলিক গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরেন। ইশতেহারে জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলন দমানোর চেষ্টাকালে সংঘটিত সহিংসতার বিচার করার অঙ্গীকারের কথা জানান এনসিপির আহ্বায়ক।

এনসিপির ইশতেহারে বলা হয়েছে– ১. নতুন সংবিধান ও সেকেন্ড রিপাবলিক গঠন, ২. জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, ৩. গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, ৪. ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা ও আইন সংস্কার, ৫. সেবামুখী প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন। এ জন্য হুইসেল ব্লোয়ার সুরক্ষা আইন করা (২০১১ সালে এ রকম একটি আইন প্রণয়ন হয়েছে), ৬. জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা, ৭. গ্রাম পার্লামেন্ট ও স্থানীয় সরকার করা, ৮. স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ নির্মাণ,  ৯. সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ১০. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ভবিষ্যতের উদ্ভাবন, শিল্পায়ন ও অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত একটি দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, ১১. গবেষণা, উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব, ৫০ বছর মেয়াদি বিভিন্ন বিজ্ঞান গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ, ১২. বহু-ভাষা, বহু-সংস্কৃতি, বহু-জাতিভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়া, ১৩. নারীর নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন, নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচন, ১৪. মানবকেন্দ্রিক ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি, ১৫. সকল কর্মক্ষম নাগরিকের জন্য দেশে ও বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ১৬. ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প বাজারে প্রবেশাধিকারে বিনিয়োগ, ১৭. কৃষি পণ্যের সরবরাহ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি ক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণ, ১৮. প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহ, অভিবাসী, পরিবহন ও স্বনিয়োজিত সকল শ্রমিকের স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ১৯. জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা, ২০. রাজধানীসহ শহরগুলোতে নদী ও খালকেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত উচ্চগতির গণপরিবহনমুখী ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ২১. জলবায়ু-সহনশীল, দূষণমুক্ত ও পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়তে নদী, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার,  ২২. প্রবাসী বাংলাদেশির মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা, ২৩. বাংলাদেশপন্থি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন, পররাষ্ট্রনীতি সব সময় দলীয় স্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখা, পাবলিক ডিপ্লোম্যাসিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ২৪. জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল হিসেবে গণপ্রতিরক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে তরুণ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত সুশৃঙ্খল শক্তি হিসেবে দেশের সর্বাত্মক সেবায় উদ্বুদ্ধ করা।

বিকেল ৪টা থেকে সমাবেশ হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর থেকেই রাজধানী ও এর আশপাশের জেলা থেকে এনসিপির নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের দিকে বৃষ্টি হলেও নেতাকর্মীদের আগমন থেমে থাকেনি। যখনই একেকটা ইউনিটের নেতাকর্মীরা আসছিলেন, তখনই মঞ্চ থেকে তাদের স্বাগত জানানো হয়। এভাবে বিকেলের মধ্যে পুরো শহীদ মিনার এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেল ৫টার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মঞ্চে উপস্থিত হন। তখন নেতাকর্মী সবাই তাঁকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানান। এর পর দলের কেন্দ্রীয় নেতারা একে একে তাদের বক্তব্য দেন।

সমাবেশে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমরা ন্যায্যতা, সমতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একটা রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে চাই। আমরা সমতা, ন্যায্যতা ও অধিকারের প্রশ্নে আপস করব না। এ ছাড়া বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশও ভূমিকা রাখবে।

সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জুলাই সনদকে কার্যকর এবং জুলাই সনদের সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকারকেই বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে গিয়েছি। মৌলিক সংস্কারের যতটুকু অর্জন হয়েছে, তার প্রতিটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই সনদের প্রতিটি কথা বাস্তবায়নের জন্য দেশের মানুষ অপেক্ষা করছে। জুলাই সনদকে কোনো কাগুজে বাঘে আমরা পরিণত হতে দেব না।

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, আমরা বাতাসের আধ্যাত্মিক মর্যাদা বুঝি। প্রতিটি জেলার অভ্যুত্থানের বাতাস আমাদের গায়ে লেগেছে। বাংলাদেশে যতগুলো বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সবই কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে হয়েছে। এই জায়গাগুলোকে গুরুত্ব না দিলে আরও একটা গণঅভ্যুত্থান হবে।

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা বলেন, আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। এমন জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যাতে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে অ্যাম্বুলেন্সেই জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা শুরু করা যায়। প্রতিটি নাগরিকের একটি ইউনিক হেলথ আইডি থাকবে, যাতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সকল তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে; কখনও হারাবে না।

উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান একটা দলের ছিল। যে সংবিধান আরেকটা দেশ থেকে পাস হয়ে এসেছে। এই মুজিববাদী সংবিধান আর বাংলাদেশে থাকতে দিতে পারি না। আমরা আজ এই মঞ্চে মুজিববাদী সংবিধান ভেঙেচুরে শেষ করে দিয়ে নতুন সংবিধান চাইতে এসেছি।

দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই বিপ্লবের এক বছর পেরিয়ে এসেছি। এই এক বছর আমরা শুধু কথা বলে গেছি; এখন সময় কাজের। আমাদের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব দিকনির্দেশনা দেবেন, আমরা তা বাস্তবায়ন করব। প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকব।

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ, যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, ঢাকা মহানগর উত্তরের সমন্বয়কারী আকরাম হোসেন, যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম, শহীদ ইমাম হাসান তাইমের ভাই রবিউল আওয়াল, এনসিপির শ্রমিক উইংয়ের সমন্বয়কারী মাজহারুল ইসলাম ফকির প্রমুখ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ