ব্রেকিং নিউজ

এলএ শাখার ৫৫ লাখ টাকার অনিয়মের গোমর-ফাঁস

জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার ক্ষতিপূরণের প্রায় ৫৫ লাখ টাকার অনিয়মের গোমর-ফাঁস হয়ে গেছে। এডিসি ও কানুনগো-দুই কর্মকর্তা একে অপরের বিরুদ্ধে সরকারি টাকা তছরুপ ও টাকার জন্য ফাইল আটকে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে পরস্পরকে দুষেছেন। কর্মকর্তাদের মধ্যে টাকা ভাগবাটোয়ার বিরোধের জের ধরে গোমর ফাঁস হয়ে যায় বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। দোহাজারী-ঘুমঘুম পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ’ প্রকল্পে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (এলএ) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও সরকারি টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন এলএ শাখার কানুনগো। কানুনগো জাহাঙ্গীর আলম এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এল এ) আমিরুল কায়সার দাবি করেন, ‘কানুনগো দুষ্টু প্রকৃতির লোক। টাকা ছাড়া ফাইলে সই করেন না। তাকে টাকা না দেওয়া ওই গরিব মানুষগুলো দুই বছর ধরে হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। ভুক্তভোগীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয়, আমি সেই উদ্যোগ নিয়েছি’। তিনি আরও বলেন, ‘একজন গরিব মানুষের ভিটেবাড়ি-ঘর, জমা-জমি হারিয়েছেন, তিনি তো ক্ষতিপূরণ পাবেনই। এছাড়াও খতিয়ান সৃজনের পর সরকার তো আর মালিক নেই। বন্দোবস্তি গ্রহীতা মালিক হয়ে গেছেন। কানুনগোকে টাকা-পয়সা না দেওয়ায় প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে গবির লোকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

এই প্রকল্পের বিষয়ে এডিসি’র সঙ্গে কানুনগোর মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কানুনগো মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে কুমিল্লার লাঙ্গলকোর্ট উপজেলা ভূমি অফিসে বদলি করে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়। বদলির আদেশ পাওয়ার পর এডিসির বিরুদ্ধে প্রকল্পের অধিগ্রহণের সরকারি টাকা আত্মসাৎ চেষ্টার অভিযোগ এনে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি। কানুনগো মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, ‘এডিসি (এলএ) আমিরুল কায়সার মহোদয় বন্দোবস্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের মধ্যে একদিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩১ টাকার চেক প্রদানের নির্দেশ দেন। যা ক্ষতিপূরণ প্রদান আইনের বিধি-বিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ১৫ বছরের মধ্যে বন্দোবস্তির জায়গা বিক্রি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ১২ বছরের মধ্যে জায়গা বিক্রি করে শর্ত ভঙ্গ করেছেন। বিক্রির সময় জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নেয়নি। একাধিক শর্ত ভঙ্গ করায় বন্দোবস্তি বাতিল হওয়ার কথা। সরকারি স্বার্থ রক্ষা করায় তাকে পুরস্কারের বদলে তিরস্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

দেখা যায়, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে মিয়ানমারের ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন প্রকল্পের’ একটি খতিয়ানে ২৪ শতক জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। এতে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ নানা অবকাঠামো ছিল। ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩১ টাকা। খতিয়ান ও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৮৫-৮৬ অর্থ বছরে চুনতি মৌজার আরএস ২৭৯৭ দাগের এক দশমিক ২১ একর জায়গা কৃষি খাস জমি হিসেবে মোহাং কালুকে বন্দোবস্তি দেয় সরকার। কৃষি জমি হিসেবে বন্দোবস্তি দেওয়া হলেও জমির শ্রেণি হচ্ছে পাউন্ডি (উচু জমি) ও দরগাহ। লোগাহাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে বন্দোবস্তি মামলা মতে বন্দোবস্তি গ্রহীতার নামে খতিয়ান সৃজন করা হয়। সেই খতিয়ান মতে জায়গা বিক্রি করা হয়েছে। বন্দোবস্তির শর্ত লঙ্ঘন করে জায়গা বিক্রি করা এবং সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও ভাগবাটোয়ারার কারণে জটিলতা দেখা দিয়েছি বলে একাধিক সূত্র জানায়।
লোহাগাড়ার এসিল্যান্ড পদ্মাসন সিংহ’র এক প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, বিএস খতিয়ানে সরকারের পক্ষে রেকর্ড রয়েছে। আর এস ২৭৯৭ দাগ মূলে ৪১৩১ দাগে এক দশমিক ২১ একর দরগাহ শ্রেণির ভূমি শ্রেণি পরিবর্তন ছাড়া বন্দোবস্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আরএস ২৭৯৭ দাগের বিএস ৪১৩৬ দাগে এক দশমিক ২১ একর ভূমি কালুর নামে ২৭৮৮ নং খতিয়ান সৃজন করা হয়। পরবর্তীতে সৃজিত খতিয়ান থেকে নামজারি মূলে বিএস ৪১৩৬ দাগের অন্দরে দশমিক ১৪শ একর (১৪ শতক) নামজারিমূলে জন্নত আরা বেগম ও দশমিক ৮ হাজার একর (৮০ শতক) জায়গা সৈয়দ আহমদের নামে খতিয়ান সৃজন হয়। বর্তমানে বন্দোবস্তি মামলামূলে সৃজিত খতিয়ানে দশমিক ২৭ একর জায়গা স্থিত রয়েছে। তাতে কালুর পক্ষে তার ওয়ারিশরা ১৪২৫ সাল পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করেছেন। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মতামত দিয়েছেন এসি ল্যা- পদ্মাসন সিংহ।

এডিসি আমিরুল কায়সার বলেন, ‘এসি ল্যান্ডও ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধের মতামত দিয়েছেন। সেই মতামতের ভিত্তিতে আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। জমির মালিকানা, স্বার্থ ও দখলদার বিবেচনা করে আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা দিই। এখানে অনিয়ম করার কোন সুযোগ নেই। এছাড়া কিছু টাকার জন্য কেউ বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইবেন কেন?

কিন্তু কানুনগো মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম তার প্রতিবেদনে দেখা যায়, খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী বন্দোবস্তি দেওয়া জমির মালিকানা সরকারের নিকট থেকে যায়। ফলে বন্দোবস্তি গ্রহীতা জমির ক্ষতিপূরণ পাবেন না। ক্ষতিপূরণের টাকা সেলামি বাবদ সরকার পাবে। আরও উল্লেখ করেছেন, বন্দোবস্তি গ্রহীতা মোহাং কালু বন্দোবস্তির শর্ত ভঙ্গ করে ১৫ বছরের আগে জায়গা বিক্রি করে দিয়েছেন। বন্দোবস্তির শর্তে রয়েছে, ১৫ বছরের মধ্যে বন্দোবস্তিকৃত জায়গার অংশ দান, বিক্রয় বা অন্য কোন উপায়ে হস্তান্তর অথবা বন্ধক বা অন্য কোন প্রকারে দায়বদ্ধ করতে পারবেন না। বন্দোবস্তির ৬নং শর্ত লঙ্ঘন করার অপরাধে বন্দোবস্তিকৃত সম্পত্তি সরকারের বাজেয়াপ্তি বলে গণ্য হবে। এছাড়াও বিক্রয় করার সময় জেলা প্রশাসকের অনুমোদনক্রমে ২৫ শতাংশ ফি রাজস্ব খাতে জমা দিয়ে বিক্রি করতে হবে। সেই নীতিমালাও মানা হয়নি। দেখা যায়, বন্দোবস্তি গ্রহীতা মোহাম্মদ কালুর নামে খতিয়ানভুক্ত করা হয়েছে। ২০০০ সালের ১৫ জানুয়ারি তার নামে খতিয়ান সৃজন ও নামজারি করা হয়। একই সনের ৫ এপ্রিল ৮০ শতক জায়গা সৈয়দ আহমদের কাছে বিক্রি করেন মোহাং কালু। ১৪ শতক জায়গা জন্নাত আরা বেগমের নামে নামজারি রয়েছে।

এডিসি আমিরুল কায়সার বলেন, বন্দোবস্তি জায়গা খতিয়ান ও নামজারি হয়ে গেলে আর সরকারের থাকে না। ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়ে যায়। কানুনগো টাকা পায়নি বলে জটিলতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তো টাকা ছাড়া ফাইলে সই করেন না, মানুষকে হয়রানিসহ নানা অভিযোগ আমাদের কাছে রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে বদলি করেছেন বিভাগীয় কমিশনার।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে ৫৮ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনার পর ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অনিয়ম-দুর্নীতি জনসম্মুখে ওঠে আসে। ওই টাকা এলএ শাখার কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওঠে এসেছিল। সেই ঘটনার পর এল এ শাখার এডিসি, কানুনগো ও সার্ভেয়ারসহ অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছিলেন এক ভুক্তভোগী।

Please follow and like us:

About bdsomoy