রবিবার, মে ১৯, ২০২৪
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়অস্থিরতা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

অস্থিরতা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

BD_TOURISM২৯ এপ্রিল সকালে দিপ্তি বিশ্বাসের হোটেলের দুইজন অতিথির মধ্যে একজন চলে গেলে তিনি বিষন্ন হয়ে পড়েন। বিশ্বাস হলেন ভিলা আইডিয়াজ হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার, এটি রাজধানীর অভিজাত গুলশান উপশহরের একটি ছোট গেস্ট হাউস। এর সাতটি স্যুটের সবগুলোই গত বছরের এপ্রিলে পরিপূর্ণ ছিল।

বিশ্বের দীর্ঘতম বালুময় প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর মধ্যে একটি, দেশে অব্যাহত সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এটি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।   “কিন্তু বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের জন্য এই ধরনের ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে গত কয়েক মাসের কিছু দিন আমাদের এমনকি একটি স্যুটেও অতিথি ছিল না,” খবর দক্ষিণ এশিয়াকে বলেছেন বিশ্বাস, সেইসাথে আরো বলেছেন যে এই গেস্ট হাউসটি মূলত বিদেশি পর্যটকদেরকে সেবা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের অনেক পর্যটন কর্মীর মধ্যেই তার উৎকন্ঠা অনুভূত হয়েছে, যারা বলছেন যে চলমান সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খাতের মধ্যে তাদের খাত একটি। তারা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে তাহলে তা জাতীয় ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এবং এর ফলে এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার উপর প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোকের জীবিকা নির্ভর করছে।

সৌন্দর্য ঐতিহ্যের চারণভূমি

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও প্রচুর নৈসর্গিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘতম বালুময় প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত এবং সুন্দরবনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের পাশাপাশি, বাংলাদেশে রয়েছে ঐতিহাসিক সিল্ক রোড বরাবর উল্লেখযোগ্য কিছু স্থান, যার মধ্যে রয়েছে বিক্রমপুর, বরিশাল, ওয়ারী বটেশ্বর, এগারোসিন্ধুর, মহাস্থানগড়, ভিটারগড় ও আরো অনেক জায়গা।

সাধারণত, এই জায়গাগুলো প্রতি বছর বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে পর্যটকদেরকে আকৃষ্ট করে থাকে – কিন্তু এখন, সংঘাতের কারণে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

হোটেল মালিক ট্যুর অপারেটররা লোকসান গুনছে

কক্সবাজারে, তিন-তারকা হোটেলের রুমগুলো সাধারণ ৫,০০০ টাকায় (৬৫ ডলার) ভাড়া হয়, কিন্তু সেগুলো এখন ১,২০০ টাকায় (১৫ ডলার) অফার দেয়া হচ্ছে। ভাড়া হওয়া রুমের সংখ্যা এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় কম।হোটেল লংবিচের সারওয়ার আলম বলেছেন যে তার ১০৪-রুমবিশিষ্ট হোটেলে সাধারণত কমপক্ষে ৫০% রুম ভাড়া থাকে। “কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে, এটা মাত্র ১৫ থেকে ২০% এ নেমে এসেছে,” বলেছেন তিনি।

সুন্দরবনেও এই পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র ভিন্ন নয়। খুলনা-ভিত্তিক একটি ট্যুর অপারেট পুগমার্ক ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস সুন্দরবনে নৌকা ভ্রমণের আয়োজন করে থাকে। পুগমার্কের মালিক নজরুল ইসলাম বাচ্চু খবরকে বলেন, “এই বছরের এপ্রিল ও মে মাসে কোনো ট্রিপ না থাকায় আমার কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা (১৫,৪০০ ডলার) লোকসান হয়েছে”। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে পর্যটকরা কমপক্ষে এক ডজন ট্রিপ বাতিল করেছে।

“সাধারণত, এপ্রিল মাসে প্রতিটি জাহাজ সুন্দরবনে চার থেকে পাঁচটি ট্রিপ দিয়ে থাকে,” বলেছেন তিনি, সেইসাথে আরো বলেছেন যে বছরের এই সময়ে কমপক্ষে এক ডজন জাহাজ সুন্দরবনে এই ধরনের ট্যুর দিয়ে থাকে। “ছোট কোম্পানি হওয়ায়, আমার লোকসান কম ছিল। তুলনামূলকভাবে, বড় ট্যুর অপারেটররা আরো বেশি লোকসান দিচ্ছে”।

দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হলে “পুনরুদ্ধার করা কঠিন”

এই খাতের ধস প্রতিরোধ করার জন্য, ৩০ মার্চ ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) ঢাকায় সমাবেশ করেছে, এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন তৈরি করেছে। টোয়াব সভাপতি হাসান মনসুর বলেন, “আমাদের সমাবেশ সত্ত্বেও, আমাদের আবেদন সম্পর্কে আমরা এখনো পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাইনি”৷

তিনি আরো বলেছেন যে, এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছিল জানুয়ারিতে, কারণ “রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কমপক্ষে ৫,০০০ পর্যটককে প্রতিশ্রুত পর্যটন সেবা দেয়া সম্ভব হয়নি”৷ তিনি বলেন, এর কারণে লোকসানের পরিমাণ “সুস্পষ্টভাবে ১ বিলিয়ন টাকারও (১২.৮ মিলিয়ন ডলার) বেশি”৷তিনি বলেন, “যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে, তাহলে এই বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নতুন মৌসুমে আমরা কোনো পর্যটক নাও দেখতে পারি। যদি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে”৷ তিনি আরো বলেন, এই ভয়ঙ্কর পরিণতি পর্যটক খাতের সাথে জড়িত কমপক্ষে ত্রিশ লাখ লোকের জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের (বিটিবি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আখতার আহমেদ বলেন, এই সমস্যার একটা সমাধান খুঁজে বের করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের সদস্যবৃন্দ, বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে বসার জন্য বোর্ড পরিকল্পনা করছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ