শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়এসএ গ্রুপ নতুন করে ব্যাংক ঋণ হাতিয়ে নিতে নিয়েছে অভিনব কৌশল

এসএ গ্রুপ নতুন করে ব্যাংক ঋণ হাতিয়ে নিতে নিয়েছে অভিনব কৌশল

১৮ ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে মেরে দেওয়া চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগ্রুপ এসএ গ্রুপ নতুন করে ব্যাংক ঋণ হাতিয়ে নিতে নিয়েছে অভিনব কৌশল। ঋণখেলাপের দায়ে নিন্দিত এই শিল্পগ্রুপের মালিক শাহাবুদ্দিন আলম দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি। ব্যাংকাররা বলছেন, এসএ গ্রুপ দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। তবু থেমে নেই তাদের অপতৎপরতা। ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ পাওয়ার কৌশল হিসেবে এই ঋণখেলাপি পরিবারের উত্তরসূরী সন্তানদের নামে খোলা হয়েছে নতুন কোম্পানি। সেই কোম্পানির নামে নতুন করে ঋণ পাওয়ার জন্য সব তদবিরই চলছে। তবে এই যাত্রায় ব্যাংকগুলো এই কোম্পানিকে ঋণ দিতে অনেক সতর্ক। তারা একই আগুনে দুবার আর পুড়তে চাইছে না।

ঋণের জন্য প্রস্তাব যাওয়া ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, ঋণখেলাপি এই শিল্পগ্রুপটি তাদের সন্তানদের নাম দিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান বানিয়েছে, নতুন মোড়কে সেগুলো আসলে ‘পুরনো মদ’ই। দেখা গেছে, কোম্পানি নতুন হলেও যে অফিস তারা ব্যবহার করছে, সেটা যথারীতি আগের কোম্পানির অফিসটাই। যে গুদাম তারা ব্যবহার করছে, সেটাও ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানেরই গুদাম। সবই পুরনো, নামটাই কেবল নতুন। এসব দেখেশুনে ব্যাংকগুলোর দৃঢ়মূল বিশ্বাস— নতুন তৈরি করা কোম্পানি মূলত নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার জন্যই বানানো।

চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলমের কাছ থেকে ১৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান চার হাজার কোটি টাকা পাবে। ঋণ হিসেবে নেওয়া বিপুল এই টাকা মেরে দিয়ে তিনি এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি। ঋণের টাকা উদ্ধারের জন্য শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ১০০টিরও বেশি মামলা আছে। চট্টগ্রামের ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণের এই অপব্যবহারে এসএ গ্রুপ দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

ঋণ জালিয়াতির মামলায় ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানের একটি কফি শপ থেকে শাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ— সিআইডি। চট্টগ্রামের ইপিজেড থানায় ব্যাংক এশিয়ার করা একটি মামলায় ওই সময় গ্রেপ্তার হন তিনি। ওই মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় শাহাবুদ্দিন আলম ঢাকার গুলশান শাখায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে সঞ্চয়ী হিসাব খুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদে ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা ও উত্তোলন করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন শাখার মোট ২৫টি হিসাবে নগদ ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে মোট ১৫৯ কোটি ৯৫ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪২ টাকা সন্দেহজনক লেনদেন করেন।

তবে গ্রেপ্তার হলেও অচিরেই তিনি বেরিয়ে আসেন জামিনে। এর পরই আঁটেন নতুন কৌশল। ছেলেদের দিয়ে চালু করেন নতুন কোম্পানি— মুসকান গ্রুপ। শাহাবুদ্দিনের ছেলে সাজ্জাদ আরেফিন আলম মুনকে এই গ্রুপের মালিক হিসেবে দেখানো হয়। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্যই মূলত নতুন কোম্পানিটি খুলেছে এসএ গ্রুপ। পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসকান গ্রুপ ইতোমধ্যে নতুন ঋণের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদন করেছে। তবে ব্যাংকাররা সেসব আবেদনে এখন পর্যন্ত সাড়া দেননি। তারা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সতর্ক। উত্তরা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার সাবেক ম্যানেজার (বর্তমানে কুমিল্লার আঞ্চলিক প্রধান) রফিক নেওয়াজ বলেন, ‘মুসকান নামে নতুন ঋণ চেয়েছিল এসএ গ্রুপ। শাহাবুদ্দিনের ছেলেকে মুসকানের মালিক হিসেবে দেখানো ঋণের প্রস্তাব আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা নতুন করে আর ঝুঁকি নিতে চাই না। জানা গেছে, মুসকান গ্রুপ আরও কয়েকটি ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করলেও ওইসব ব্যাংকও সাড়া দেয়নি।

শাহাবুদ্দিন আলমকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ আখ্যা দিয়ে ব্যাংক এশিয়ার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান একেএম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা তার নেই। ফলে মুসকানকে ঋণ দেওয়া এসএ গ্রুপের মতই ঝুঁকিপূর্ণ।

ইসলামী ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার প্রধান মিয়া মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ বলেন, ‘ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে রাখা এসএ গ্রুপের জামানতের মূল্য তাদের নেওয়া ঋণের তুলনায় অনেকগুণ কম। এ কারণে ঋণ আদায়ের জন্য আমাদের আইনি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এখন এসএ গ্রুপ ঋণ রিশিডিউলিংয়ের জন্য আবার আবেদন করেছে। আমরা সেই আবেদন আমাদের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে তিনি এও বলেন, ‘যদি কোনো ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান নতুন নামে ব্যবসা শুরু করে, তাহলে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ব্যাংকের নেই।

এসএ গ্রুপ থেকে ইসলামী ব্যাংক পাবে সর্বোচ্চ ৬০০ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পাবে ৪৮১ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়ার পাওনা ৩৩৮ কোটি টাকা, পুবালী ব্যাংক পাবে ২৮৮ কোটি টাকা। এসএ গ্রুপ এছাড়া ঢাকা ব্যাংক থেকে ২৪৭ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ২২১ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংক থেকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। চট্টগ্রাম এই শিল্পগ্রুপটির কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের ঋণের টাকা পাবে রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, প্রাইম লিজিং, কমার্স ব্যাংক, মাইডাস ফাইন্যান্স এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।

গত বছরের জুনে জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ যে ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়, ওই তালিকার প্রথম প্রতিষ্ঠানটির নামই ছিল সামাননাজ সুপার অয়েল। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণই কেবল এক হাজার ৪৯ কোটি টাকা। তালিকার ১২৩ নম্বরেও আছে এই গ্রুপের আরও একটি প্রতিষ্ঠান। সামাননাজ কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড নামের সেই প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১২৭ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে খেলাপি ঋণের তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ওই তালিকায়ও এসএ গ্রুপের অপর একটি প্রতিষ্ঠান এসএ অয়েল রিফাইনারী ৯৩৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে তালিকার ৬ নম্বরে স্থান পায়।

গত বছরের অক্টোবরে এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলম, তার স্ত্রী ইয়াসমীন আলম, দুই ছেলে সাজ্জাদ আরেফিন আলম ও শাহরিয়ার আরেফিন আলমের সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর আগে ২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনায় শাহাবুদ্দিন আলম, তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলম ও ব্যাংকটির অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক সামছুল আলম।

১৯৮৮ সাল থেকে দেশে ব্যবসা করে আসছে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসএ গ্রুপ। এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড, লায়ন বনস্পতি প্রোডাক্টস লিমিটেড, সামাননাজ সুপার অয়েল লিমিটেড, কামাল ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, সাউথ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডসহ আরও নানা প্রতিষ্ঠান। তবে এসবের অনেকগুলো কোম্পানিই নামসর্বস্ব। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্যই মূলত এসব কোম্পানি গড়ে তোলা হয়েছিল নামমাত্র।

সাত বছর আগে চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত খুলশীর হাবিব লেনে বিলাসবহুল বাড়ি গড়েন এসএ গ্রুপের কর্ণধার শাহাবুদ্দিন আলম। প্রায় পাঁচ একর জায়গায় ৫৭ হাজার বর্গফুটের বাড়িটি নির্মাণ করতে জমিসহ কমপক্ষে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম নগরীতে এমন প্রাসাদোপম বাড়ি হাতেগোনা। পুরো বাড়িতে আলাদা আলাদা ভবন ছাড়াও আছে হেলিপ্যাড, মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, একাধিক খেলার মাঠ ও কোর্ট, জিমনেসিয়াম, কনফারেন্স হল, বৈঠকখানা, বাগান, পার্ক ও শিশুদের খেলার স্থান। বাড়ির ভেতরে রয়েছে পুকুরের সমান আধুনিক সুইমিংপুল। এই জায়গার বেশ অনেকখানি অবশ্য জোর করে দখল করেছেন শাহাবুদ্দিন আলম। এর মধ্যে কিছু আছে রেলের জমিও। শাহাবুদ্দিনের ঘনিষ্ঠজনদের দেওয়া তথ্যমতে, পুরো বাড়িটিই ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় গড়া।

ব্যাংকারদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামেই শুধু নয়, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জেও এমন বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে শাহাবুদ্দিনের। এসবও ঋণের টাকায় নির্মিত। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড এলাকায় রয়েছে শাহাবুদ্দিনের পুরনো বাড়ি। ২০১৪ সালে শাহাবুদ্দিন আলমের ছেলে সাজ্জাদ আরেফিন আলম মুনের সঙ্গে ফিনলে গ্রুপের কর্ণধার শওকত আলী চৌধুরীর মেয়ে জারার বিয়ে হয়। এই বিয়েতেও অন্তত ১০০ কোটি খরচ করেছেন এক শাহাবুদ্দিনই। সবই ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা— এমন অভিমত তার ঘনিষ্ঠজনদের।  –  চট্টগ্রাম প্রতিদিন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ