স্পোর্টস ডেস্ক (বিডি সময় ২৪ ডটকম)
ফুটবল, বেসবল, বাস্কেটবল, আইসহকি কিংবা অ্যাথলেটিক্সের বিভিন্ন ইভেন্টের তুলনায় ক্রিকেট দেখে ও বুঝে পৃথিবীর খুব কম দেশই। কিন্তু জনসংখ্যার হিসাবে ক্রিকেট দেখে ও বুঝে ওইসব দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এরকম এক সমীকরণে ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে। কখনো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিচ্ছে, কখনোবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও প্রতিবেশী ভারত আর পাকিস্তানকেও। ক্রিকেট নিয়ে এরকম গর্বের বিষয়টি বেশ আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন প্রত্যেক বাংলাদেশি।
ক্রিকেটের এ আলোচনায় এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরকে বলা হয় বাণিজ্যিক রাজধানী। শহর হিসেবে এর গুরুত্ব ভারতের মুম্বাই কিংবা পাকিস্তানের করাচির সমান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার আগে এবং পরের হিসেবে চট্টগ্রামের প্রাপ্তি ও উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করলে হতাশ হতে হবে চট্টগ্রামবাসীকে। কেন্দ্র থেকে ন্যায্য হিস্যা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে চট্টগ্রাম। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধকে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় এজন্য। নেতারাও অকপটে এই কারণটি স্বীকার করেন।
ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হিসেবে এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। তিনি ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে পরিচালক পদে নির্বাচন করবেন। আর আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দিনও পরিচালক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এরা দু’জনেই বিসিবি’র বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের প্যানেলের।
আকরাম খান বিসিবি’র কাউন্সিলর হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরেরই (আলম) কাউন্সিলর হওয়ার কথা। আলমকে সরিয়ে আকরামকে কাউন্সিলর করার ঘটনা এখন অনেক কারণে আলোচিত ও সমালোচিত। আলম হলেন আকরামের ছোট বোন রোকসানার স্বামী। তার চেয়ে বড় কথা হল তারা দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাদের দু’জনের সম্পর্ক ছিল মধুর ও উষ্ণ। পারিবারিক ও বন্ধুত্বের এ সম্পর্ক এখন আর আগের অবস্থানে নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চট্টগ্রামের ছেলে আকরাম ছেলের মতই। আদরে ও মমতায় তাকে আগলে রাখেন এটি তো সত্য। শোনা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় আকরাম বিসিবি’র পরিচালক হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছেন। কিন্তু নিজের ভগ্নিপতিকে সরিয়ে দিয়ে এরকম জায়গায় নিজে বসে যাওয়ার মত মানসিকতা কি আকরামের আছে? এ বিষয়ে আমরা যারা আকরামকে চিনি তাদের অনেক সন্দেহ ও প্রশ্ন। আকরাম আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক ও বিনয়ী। মেধা ও বুদ্ধির তুলনায় বিনয় তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু রাজনীতির কূটচাল তিনি কতটা বুঝবেন?
আ জ ম নাছির প্রসঙ্গেও আসা যাক। তিনি এখন চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতির আলোচিত ও সমালোচিত নেতা। মা ভক্ত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, নেপথ্যে থাকতে পছন্দ করেন কিন্তু তার অতীত রাজনীতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন সাধারণের। হয়ত তিনি ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন অনেক আগ থেকেই। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন আলমের হাত ধরেই। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হতে পারে। সেই বিতর্কে আ জ ম নাছির জিততেও পারেন। কিন্তু বাস্তবতা বলে একটি শব্দ আছে। সেই শব্দের সঙ্গে আমরা যারা ক্রীড়াঙ্গনের খবর রাখি তারা অতি পরিচিত।
যুক্তি, তর্ক, আবেগ ও বাস্তবতা-যে কোনো বিবেচনায় আলমকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি একেবারেই অনুচিত। এই লেখা পড়ে মনে হতে পারে আমরা বুঝি আলমের পক্ষেই অবস্থান নিলাম। আসলে কি সেরকম কিছু? সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের ছেলে ও বিসিবি’র সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচনী কৌশলের কাছেই চট্টগ্রাম কিছুটা পিছিয়ে পড়ল। বর্তমান সভাপতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন আমাদের আকরাম খান। অনেকটা বুঝে কিংবা রাজনীতির ভবিষ্যত বিবেচনা করেই আ জ ম নাছিরও একই পথের পথিক।
আকরাম বিসিবি’র পরিচালক হতে চান-ধরে নিলাম এটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরকে বাদ দিয়ে কেন হতে হবে! জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনীত কোটায় অনায়াসেই আকরাম বিসিবি’র পরিচালক হতে পারতেন। নির্বাচনী দৌড়ের জয় পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকতেন না আ জ ম নাছিরও। আর সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর যদি কাউন্সিলর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন তিনিও হয়ত বিসিবি’র পরিচালক হতে পারতেন। তাহলে এক নির্বাচনেই চট্টগ্রাম থেকে বিসিবিতে চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করতে পারত তিনজন পরিচালক। এই তিনজন মিলেই চট্টগ্রামের ক্রিকেট উন্নয়নে অনেক অবদান রাখতে পারতেন আগামীতে। এদের সবার তুলনায় আকরাম-আলমই বরং অনেক বেশি কাজ করতে পারতেন কারণ দু’জনেরই দেশ-বিদেশের অনেক অভিজ্ঞতা। বোর্ডে অনেকদিন পরিচালক ছিলেন আলম-সেখানে অনেক গ্রুপ, অনেক আঞ্চলিকতা, অনেক ক্রীড়া রাজনীতি। আ জ ম নাছির ভূমিকা রাখতে পারতেন তার রাজনৈতিক বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে।
এটা ঠিক ‘রাজনীতি’, ‘নির্বাচন’, ‘ক্ষমতা’, ‘অর্থ’ ও ‘প্রভাব’-এতটাই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ও জটিল যে এই তিনজনই বিসিবি’র পরিচালক হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা যাবে না। কিন্তু দিন শেষে এই সান্ত্বনাতো পাওয়া যেত চট্টগ্রামের সবাই এক সুরে বা একই ট্র্যাকে ছিলেন। ওই যে শুরুতে বললাম, কেন্দ্র অর্থাৎ ঢাকা সবসময় চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করে। বঞ্চিত করার কূটকৌশলে চট্টগ্রামের লোকেরাও মনের অজান্তে কিংবা অবচেতন মনে অথবা জেনেশুনে অংশীদার হয়ে যায়।
বিসিবি’র সাবেক সভাপতি আ ফ ম কামাল (লোটাস কামাল) বিদায় নেওয়ার পর কে হবেন পরবর্তী সভাপতি এ নিয়ে পরিচালকদের অনেকেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। কেউ নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গী হলেন আবার কেউ সাবের হোসেনের। পাপন বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর বোর্ডের সভায় অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেন সাবেক বোর্ড পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। এমনকি মিডিয়াতেও কথা বলেছেন যা সরাসরি পাপনের বিরুদ্ধে গেছে বলে মনে করা হয়। শুধু আলম নয়, আরো অনেকেই পাপনের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন। তাদের সবাই আজ বিসিবি’র কাউন্সিলর অর্থাৎ ভোটার। কেবল চট্টগ্রামের আলম বাদ পড়লেন! কিসের জোরে কার ইচ্ছায় এরকম হল সেটি অনুসন্ধানের বিষয়।
সাধারণভাবে এরকম আলোচনা হচ্ছে যে বিসিবি সভাপতি তার পথের কাঁটা দূর করলেন আমাদের লোকদের দিয়েই। ঘনিষ্ঠ বন্ধু আলম বাদ পড়ে যাচ্ছেন এটি নিশ্চিত জেনেও নির্বিকার ছিলেন আকরাম। আর আলমের দোষ তিনি কেন আকরামের কাছে গিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন না। আলমের বাদ পড়ার পরিকল্পনার কথা আ জ ম নাছির সময়ে সময়ে তাকে জানিয়েছিলেন। সেখানেও আলম উদ্যোগী হলেন না। ধরে নিলাম সবই আলমের খামখেয়ালীপনা। তাহলে বাকি দুইজন কেন ভূমিকা রাখলেন না আলমের জন্য। এরকম নানা ও অসংখ্য যুক্তি-বিতর্ক হবে অনেকদিন। কিন্তু দেশের ক্রিকেটে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম যে একটু পিছিয়ে পড়ল সে কথা আলোচিত হবে তার চেয়েও বেশিদিন।
কেন? উত্তর অনেকগুলো আছে। ১. গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চট্টগ্রাম ভেন্যুর চেয়ারম্যান ছিলেন সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। এই ভেন্যুর দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ জয় পায়। লাকি গ্রাউন্ডের সফল সংগঠক তিনি। ২. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের কৃতি ছাত্র পড়ালেখা শেষে একই বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। খেলার টানে সে চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি পরিচালকের চাকরি নিয়ে জড়িয়ে থাকেন খেলাধুলায়। ৩. দেশের অন্য জেলা থেকে কিংবা খোদ রাজধানী ঢাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা সংগঠকদের চেয়ে চট্টগ্রামের আলমকে অনায়াসে আলাদা করা যাবে-কারণ তিনি দক্ষ, স্মার্ট ও যোগ্য সংগঠক।
ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই। গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল দেখার জন্য আমি কলম্বো ও মুম্বাই গিয়েছিলাম। সেই ট্যুরে আলমসহ বিসিবি’র অনেক পরিচালককে দেখা ও মেশার সুযোগ হয়েছিল। তখন মনে হয়েছে সত্যিই আলম অনেক বেশি এগিয়ে আমাদের সবার তুলনায়। বিদেশিদের সঙ্গে নানা বিষয়ে তর্ক ও আলোচনায় তিনিই ছিলেন নেতৃত্বে। কারণ তত্ত্ব, তথ্য, ভাষাজ্ঞান ও যুক্তিতে তাকে বিদেশিরা কাবু করতে পারেনি কখনো। তখন আমার ভাল লেগেছে আমার বয়সী চট্টগ্রামের একটি ছেলে কীভাবে সবাইকে, সবকিছুকে ম্যানেজ করে চলতে পারেন।




