অবশেষে বহুল প্রত্যাশার এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের শিল্প কারখানা এবং বাসা–বাড়িতে গতকাল বিকেল থেকে এলএনজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। আনোয়ারার সিটি গেট স্টেশন (সিজিএস) হয়ে এলএনজি প্রবাহ চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহের প্রধান লাইনে প্রবেশ করছে। দেশে চট্টগ্রামই প্রথম এলএনজি পেলো। শুরুতে দৈনিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেয়া হচ্ছে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বরের পর ক্রমান্বয়ে গ্যাসের পরিমাণ বাড়ানো হবে। এলএনজি সরবরাহ দেয়াকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় তারিখ পরিবর্তনে পুরো বিষয়টি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। অবশেষে ছয় দফা তারিখ পিছিয়ে হলেও চট্টগ্রামের শিল্প কারখানায় এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা এবং আবাসিকের গ্যাস সংকট কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়েছিল । গ্যাস সংকট কাটাতে সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বছর দুয়েক আগে। এরই অংশ হিসেবে মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ এবং ওখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়। তৈরি করা হয় প্রকল্প। মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন করে এলএনজি প্রসেসিং করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা এবং ন্যাশনাল গ্রিডে সরবরাহ দেয়ার জন্য আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় মহেশখালীর জিটিসিএল–এর স্টেশন থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সিজিএস পর্যন্ত ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার এবং আনোয়ারা থেকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট সিজিএস পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়।
উক্ত পাইপ লাইন নির্মাণ করার পর চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু করার কথা ছিল গত ২৫ এপ্রিল। কিন্তু সরবরাহ শুরু করার দিন কয়েক আগে তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে ১০ মে করা হয়। গ্যাস সরবরাহের দিনক্ষণ পিছিয়ে দেয়া হলেও নির্দিষ্ট দিনে এলএনজিবাহী জাহাজ চলে আসে মহেশখালীতে। গত ২৪ এপ্রিল এলএনজিবাহী দেশের প্রথম জাহাজ ‘এমটি এঙিলেন্স’ মহেশখালীর উপকুলে অবস্থান নেয়। জাহাজটিতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯শ’ ঘনমিটার (৬০ হাজার ৪৭ টন) গ্যাস রয়েছে। এই জাহাজটিই এলএনজি সরবরাহের ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আগামী ১৫ বছর এই জাহাজটি ওখানে অবস্থান করবে। পরবর্তীতে এলএনজি নিয়ে আসা অন্য জাহাজগুলো এই জাহাজটির পাশে অবস্থান নিয়ে গ্যাস সরবরাহ দিয়ে চলে যাবে। এমটি এঙিলেন্স ছাড়াও ছয়টি টাগ বোটও মোতায়ন করা হয় মহেশখালীতে। এগুলো কোনটি জ্বালানি পরিবহন করবে, কোনটি চট্টগ্রামের সাথে নাবিক এবং প্রকৌশলীদের আনা নেয়ার কাজ করবে। সব আয়োজন সম্পন্ন করা হলেও আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার পাইপ লাইনে কোন সমস্যা না হলেও আনোয়ারা থেকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন পুরো প্রকল্পটিকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। আমেরিকান কোম্পানি এঙিলারেট এই পাইপ লাইন স্থাপন করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার কবলে পড়ে। বিশেষ করে সাগরের তলদেশে পাইপ লাইন স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে। উত্তাল সাগরে দিনের পর দিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে সাগর কবে শান্ত হবে। শুধুমাত্র এই পাইপ লাইনটির কারনেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং ঘাটে গ্যাসবাহী জাহাজ বসে থাকলেও গ্যাস সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়নি।
অবশেষ গত ১৪ আগস্ট কমিশনিং করে বিশেষ ব্যবস্থায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়। শুরুতে প্রেসার প্রত্যাশিত পর্যায়ে না যাওয়ায় প্রেসার বাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। গতকাল বিকেল আড়াইটা থেকে চট্টগ্রামের লাইনে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। শুরুতে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস চট্টগ্রামে দেয়া হবে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দৈনিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়া হবে। এরপর দৈনিক ১০০মিলিয়ন, ১৫০ মিলিয়ন এবং ২০০ মিলিয়ন হয়ে দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা হবে। এই গ্যাস শুধুমাত্র চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হবে। এখান থেকে গ্রিডে কোন গ্যাস দেয়া হবে না। তবে বর্তমানে চট্টগ্রামে যে ২১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিড থেকে দেয়া হচ্ছে তা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে গ্রিডের গ্যাস সাশ্রয় করে ঢাকা অঞ্চলে সরবরাহ বাড়ানো হবে। চট্টগ্রামের পুরো গ্যাস সেক্টর ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজির সাথে গ্রিড থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস দিয়ে পরিচালিত হবে। পরবর্তীতে লাইনের সংকটগুলো কাটিয়ে উঠা গেলে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ দেয়া হবে। তখন ফৌজদারহাটস্থ সিজিএস হয়ে এলএনজি গ্রিডে সরবরাহ দেয়া হবে। আপাতত সাবমেরিন পাইপ লাইনসহ আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট সিজিএস পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইন ব্যবহার করা হচ্ছে না। আরো কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই লাইনটিতে গ্যাস দেয়া হবে। এই লাইনটি চালু না হলেও আনোয়ারার সিজিএস ব্যবহার করে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মেইন রিং লাইনে দৈনিক ৩০০মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রবাহ করতে কোন সমস্যা হবে না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এলএনজি সরবরাহ শুরুর প্রস্তুতি দেখতে জ্বালানি সচিব আবু হেনা মোহাম্মদ রহমাতুল মুনিম এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজ উল্ল্যাহ চট্টগ্রামে এসে আনোয়ারার সিজিএস পরিদর্শন করেছেন। দেশের জ্বালানি খাতের এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে জিটিসিএল–কে এলএনজি সরবরাহের পুরো বিষয়টি খুবই নিবিড়ভাবে মনিটরিং এবং সব পয়েন্টে যাতে সুষম বন্টন হয় তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়। চট্টগ্রামে এখন বাখরাবাদ লাইন হয়ে কুমিল্লা অঞ্চল থেকে এবং অন্যদিকে আনোয়ারা দিয়ে মহেশখালী থেকে গ্যাস আসছে। দু’দিকের গ্যাস প্রবাহ যাতে কোন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি না করে সেদিকে সতর্ক থাকতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষনিক লোক নিয়োগ এবং নিবিড়ভাবে মনিটরিং করারও নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া ইতোমধ্যে আবেদন করে ডিমান্ড নোট পেমেন্ট করেছে এমন শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাস সংযোগ দেয়ার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনুসর মোহাম্মদ ফয়েজ উল্ল্যাহর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমরা কিছুটা সমস্যায় থাকলেও গ্যাস সরবরাহ ভালোয় ভালোয় করতে পেরেছি। আমাদের লাইনের কমিশনিং শেষ করে চট্টগ্রামের প্রধান সরবরাহ লাইনে আমরা গ্যাস প্রবাহ শুরু করেছি। এতে করে চট্টগ্রামে আর গ্যাসের সংকট থাকবে না। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক প্রতিকুলতাসহ কিছুটা সমস্যায় আমরা নির্ধারিত তারিখে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারিনি। এতে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আমরা শিল্প কারখানায় গ্যাস পৌঁছাতে পেরেছি। এটিই আমাদের শান্তনা। তিনি চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গ্যাস নির্ভর ক্ষেত্রগুলোতে আর গ্যাসের অভাব হবে না বলেও উল্লেখ করেন।
গতকাল কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়ের আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এলএনজি প্রাপ্তি এবং সরবরাহ শুরু করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমরা এলএনজি পাচ্ছি। গ্রিড থেকে আমরা যেই গ্যাস পাই তার সাথে এলএনজি যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামে সরবরাহ শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শুরুতে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট পেলেও ক্রমান্বয়ে এর পরিমান বাড়বে বলেও জানান তিনি।
এই ব্যাপারে চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম দৈনিক জানান, চট্টগ্রামের শিল্প–কারখানাই শুধু্ নয়, চট্টগ্রামের সার্বিক অর্থনীতির জন্যই এটি একটি বড় সুখবর। আমরা গত কয়েক মাস ধরে তীর্থের কাকের মতো এলএনজির অপেক্ষা করছি। আমাদের বহু শিল্পকারখানার মালিক হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বহু কারখানা বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনে বসিয়ে রেখেছে। শুধুমাত্র এলএনজি সরবরাহ শুরু না হওয়ায় বহু কাজই ঝুলে গিয়েছিল। দফায় দফায় তারিখ পরিবর্তনে আমরা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম বলে উল্লেখ করে মাহবুবুল আলম বলেন, পুরো ব্যাপারাটিতে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে আসলে কী হচ্ছে। গ্যাস আদৌ পাবো কিনা তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছিল। চেম্বার প্রেসিডেন্ট চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়াকে ঈদের বিশেষ উপহার হিসেবে দেখছে বলে মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, মহেশখালী টার্মিনালের রি–গ্যাসিফিকেশন অর্থাৎ এলএনজি থেকে গ্যাসে রূপান্তরের ক্ষমতা দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ঘনফুট। দেশে বর্তমানে দৈনিক ৩৬শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৬৫০ থেকে ২৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। চট্টগ্রামে সরবরাহ হতো সর্বোচ্চ ২১৫ থেকে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এখন এলএনজি সরবরাহ শুরু হওয়ায় গ্যাস সংকট স্থায়ীভাবে ঘুচবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।




