উপজেলার ফৌজদারহাটে বহুজাতিক ওষুধ কম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) কারখানা হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করায় বিপদে পড়েছেন কর্মরত প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। তাঁদের অভিযোগ, এই কারখানা গত বছরও বিপুল অংকের মুনাফা করেছে। লোকসানের অজুহাতে কারখানা বন্ধের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে উল্লেখ করে কারখানা পুনরায় চালুর দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে কারখানা স্থাপন করে ১৯৬৭ সালে। এখানে শিশুখাদ্য, হরলিক্স, ছোট বাচ্চাদের স্ট্রং ডায়রিয়া ও লোটা ভাইরাসের ওষুধ, হেপাটাইটিস এবিসি এবং মহিলাদের জরায়ু ক্যান্সারের ওষুধসহ অনেক ওষুধ তৈরি হয়। অল্প সময়ে কম্পানিটির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শুরু থেকে কখনো লোকসান গুনতে হয়নি এ প্রতিষ্ঠানকে। বরং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের আয়তন ও জনবল বাড়তে থাকে। বর্তমানে এখানে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
গত অর্থ বছরে কম্পানিটি শ্রমিক-কর্মচারীদের ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। এ ছাড়া এসব কারণে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন কারখানায় কোনো শ্রমিক অসন্তোষের কথা শোনা যায়নি কখনো। ঠিক এমনি অবস্থায় গত ২৬ জুলাই ওই প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে জানিয়ে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেন কম্পানির দক্ষিণ এশিয়ার ‘রিজিওনাল হেড অব সাপ্লাই চেইন’ রাজু কৃঞ্চ গোস্বামী। তাঁর এ ঘোষণায় বেকায়দায় পড়েন শ্রমিক-কর্মচারীরা। দিশাহারা হতাশ শ্রমিকরা ওই মুহূর্তে রাজু কৃষ্ণ গোস্বামীকে ঘেরাও করে রাখেন। কিন্তু তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলে সেদিনের মতো অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারখানায় পুনরায় উৎপাদন শুরুর কোনো লক্ষণ না দেখায় শুক্রবার থেকে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছেন প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক-কর্মচারীরা। শনিবার ফৌজদারহাটে কারখানার সামনে শ্রমিকরা আবারও আন্দোলন শুরু করেন। বেলা ১১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত তাঁরা কারখানার সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের একটাই দাবি, কারখানায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে হবে।
জানতে চাইলে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন কারখানা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘১৯৬৭ সাল থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠান কখনো লোকসানের শিকার হয়নি।’ তিনি জানান, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে কম্পানি মুনাফা অর্জন করেছে ৩৫১ কোটি ৭৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এ সময় জাতীয় রাজস্ব খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন। গত বছরও প্রতিষ্ঠানের সকল শ্রমিক-কর্মচারীকে লাভের ৫ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। ইলিয়াছ বলেন, ‘কম্পানির ম্যানেজার, ডিরেক্টররা সবাই আগের চেয়ে এখন দ্বিগুণ বেতন পান। যার বেতন ছিলো ৭ লাখ তা এখন বেড়ে হয়েছে ১৪ লাখ। এরপরও কী করে এ প্রতিষ্ঠানকে অলাভজনক বলা হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি, বন্ধ করে দেওয়াটা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রেরই অংশ।’
কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আজম বলেন, ‘গত ২ বছর ধরে আমাদের কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন ইরান শাফি নামে এক পাকিস্তানি নাগরিক। গত ১ জুলাই তিনি ইন্দোনেশিয়ার কারখানার দায়িত্ব নিয়ে চলে যান। মূলত তিনিই কারখানা বন্ধের পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন বলে আমাদের ধারণা।’ আজম আরো বলেন, ‘বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে পুনরায় উৎপাদন শুরুর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে।’
কারখানার ম্যানেজমেন্টের লাইন ম্যানেজার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমিও চাই না কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আমি কেউ না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবে।’ তবে এ সময় তিনি আর কোনো কর্মকর্তার মোবাইল নম্বর দিতেও রাজি হননি।




