সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা কারখানা সরিয়ে নেওয়ার জন্য মায়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন। তিনি বলেন, “আমরা মায়ানমারকে বলবো, তোমরা সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা কারখানা সরিয়ে নাও। আমরা তোমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপরায়ণ সম্পর্ক চাই।’’ শনিবার দুপুরে নগরীর পতেঙ্গায় র্যাব-৭ এর সদর দফতরে মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মায়ানমার ইয়াবা তৈরি করে, ভারত করে ফেনসিডিল। কিন্তু আমরা কোনো মাদক তৈরি করি না। অথচ এর কুফল ভোগ করছি আমরা। ভারত ও মায়ানমার থেকে মাদকদ্রব্য পাচার রোধের জন্য আমরা দুই দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। ভারত আমাদের কথামতো সীমান্ত এলাকা থেকে ফেনসিডিল কারখানা সরিয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য এম এ লতিফ, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, বিভাগীয় কমিশনার রুহুল আমিন, নগর পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল মিফতা উদ্দীন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. ফজলুর রহমান। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী ও মোস্তাফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, জেলা পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার, র্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর মাদক নির্মুলে কাজ করার জন্য বলেছেন। আমি মাদকদ্রব্য নির্মুলে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু মাদকের সহজলভ্যতার কারণে তা সহজেই নির্মুল করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ একজন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী গ্রেফতার হলে কেউ তার বিরুদ্ধে গিয়ে সাক্ষী দেয় না। ফলে আইনের ফাঁকফোকরে সে কারগার থেকে বেরিয়ে আবারও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে কারাগারের একটা বড় অংশই মাদকসেবী। এটি নির্মুলে জনগণকেই সম্পৃক্ত হতে হবে। গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। মাদক নির্মুলে র্যাব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্রে গিয়ে মাদক ধরা র্যাবের কাজ না। কিন্তু দেশের প্রয়োজনে তারা সেটি করছে। সমু্দ্রে অভিযান চালাতে র্যাবকে একটি জাহাজ দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে তারা মাদক উদ্ধারে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছে। র্যাবকে আরও ঢেলে সাজানো হবে। আমাদের প্রয়োজনে র্যাবকে যেখানে চাইব, র্যাব সেখানেই যাবে। ’
সভা শেষে সাংবাদিকদের এক বিফ্রিংয়ে হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে হত্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পুলিশ অত্যান্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রথমদিনেই জড়িত কয়েকজনকে ধরেছে, র্যাবও একজনকে ধরেছে। গ্রেফতারকৃতরা তাদের অপকর্মের কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ দু’একদিনের মধ্যেই এর মূল কাহিনী জনগণের সামনে তুলে ধরবে। সাম্প্রতিককালে পুলিশের কিছু সদস্যের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘১ লাখ ৭০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী পুলিশ। এর মধ্যে দু’একজন দুষ্কৃত কাজ করে থাকতে পারে। নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রমাণ হলেই তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এটি কার্যকর থাকবে। আলোচনা সভায় র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘মায়ানমার ইয়াবা উৎপাদন করে, কিন্তু তারা তো ইয়াবা খায় না, আমরা কেনো খাবো? আমরা চাই সবাই সচেতন হোক। মাদক আর না থাকুক। এরকম ধ্বংস উৎসবও আমাদের আর করতে না হোক।
তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর প্রশাসন দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ১৬ কোটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা অর্থ দিয়ে কেনো আমাদের সক্ষমতাকে ধ্বংস করবো? ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আমরা মাদকের বিষয়ে কোনো আপোস করবো না। সে যত বড়ই ক্ষমতাবান হোক না কেনো। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে আমরা যারা জনপ্রতিনিধি তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’ মেয়র শিশুদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনা করতে পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়ে আলাদা একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমার দলে (আওয়ামী লীগ) কোনো মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে সুযোগ দেওয়া হবে না।রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোনো মাদকসেবীর জায়গা নেই। তিনি ছাত্রলীগকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার আগে মাদকের ভয়াবহতা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতনামূলক বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেন।
নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মাদক নির্মুলের বিষয়ে এখানে কথা বললাম, তারপর চলে গেলাম, এভাবে মাদক দ্রব্য নির্মুল করা যাবে না। যারা মাদকদ্রব্য আনার সঙ্গে জড়িত তাদের ধরতে হবে। যে পথে মাদক আসছে সেই পথটা রুদ্ধ করতে হবে। মাদক ব্যবসা করে কেউ কেউ অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছেন উল্লেখ করে নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, ‘একজন সামান্য ব্যবসায়ী তিনি কীভাবে রাতারাতি এত টাকার মালিক হন। এরকম যারা ইয়াবা ব্যবসা করছেন তাদের ধরতে হবে। সংসদ সদস্য এম এ লতিফ বলেন, ‘র্যাব আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে আমি তাই র্যাবকে বলবো রহমত অব আল্লাহ ফর বাংলাদেশ। ’ তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। নগর পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল বলেন, ‘এদেশের মাদকের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিও নির্মুল হবে। ’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্থানীয় টিএসপি কমপ্লেক্স উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যৈষ্ঠ শিক্ষক আব্দুল আলিম, স্কুলের শিক্ষার্থী তাসমিয়া আল শিরোপা, অভিভাবক মোহাম্মদ হোসেন বক্তব্য দেন। এছাড়া মাদক সেবন করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গল্প শোনান মাদকসেবী মোহাম্মদ সাব্বির ও মাদক থেকে সম্প্রতি সরে আসা জাবেদ মাহমুদ সুমন। আলোচনা সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় ১৮২ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।




