মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর স্পিডবোটের মাধ্যমে শতাধিক যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে ১১৮ জন নিখোঁজ যাত্রীর একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক জানান। সোমবার দুর্ঘটনার পরপরই নূসরাত জাহান হীরা (২০) নামের এক মেডিকেল ছাত্রী এবং আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক নারীর লাশ পাওয়া যায়।এরপর আর নতুন কোনো মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান।
এদিকে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে সোমবার দুপুরের পর থেকেই ভারী হয়ে ওঠে পদ্মা তীরের পরিবেশ। সারারাত অপেক্ষার পরও উদ্ধারকাজে কোনো অগ্রগতি না দেখে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার পর মাওয়া ঘাটে ঢোকার রাস্তায় ভ্যান উল্টে ফেলে অবরোধ করেন। এ সময় শ’ দেড়েক বিক্ষুব্ধকে মাওয়া ঘাটের মুখে পদ্মা রেস্ট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে দেখা যায়। বিআইডব্লিউটির নৌযান লক্ষ্য করে তাদের কেউ কেউ ঢিলও ছোড়েন। অবরোধের কারণে ঘাটে যানবাহন ঢুকতে না পারায় প্রায় আধা কিলোমিটার সড়কে গাড়ির জট সৃষ্টি হয়। তবে জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা এসে বিক্ষুব্ধ স্বজনদের বুঝিয়ে সরিয়ে নিলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আবার ঘাটে যানবাহন ঢোকা শুরু হয়।
উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা বিআইডব্লিটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. জসিম বলেন, আমরা সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্পিডবোট, ওয়ার্ক বোট, টাগবোটসহ বিভিন্ন ধরনের জলযান নিয়ে চাঁদপুর থেকে মাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে, যাতে ভেসে যাওয়া লাশের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে উত্তাল নদীতে এখন পর্যন্ত পিনাক-৬ এর অবস্থান সনাক্ত করতে না পারায় উদ্ধার অভিযানে কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। রাতে বোটে করে নদীতে তল্লাশি চলেলেও সকাল ৬টা থেকে আবারো লঞ্চের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। বিআইডব্লিউটিএ, নৌবাহিনী ও ফায়সার্ভিসের স্পিড বোটে করে ১৩ জন ডুবুরি লঞ্চটি খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক শফিকুল হক জানান, মাওয়া লঞ্চ ঘাট থেকে পৌনে ১ কিলোমিটার দূরে লৌহজং চ্যানেলে লঞ্চটি ডুবেছে ধরে নিয়ে ‘সাইড স্ক্যানার সোনার’ দিয়ে নৌযানটি খোঁজা হচ্ছে। উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম, নির্ভীকসহ ১৫টি নৌযান সেখানে রয়েছে। কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। নদীর ওই এলাকায় পানির গভীরতা ৮০ থেকে ৯০ ফুট। সেখানে পানিতে একটি প্রবল ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেই ওই জায়গাটি তল্লাশির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে নদীতে প্রচুর পলি আর বালি থাকে বলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসছে। উদ্ধারকারীরা বলছেন, যতো বেশি সময় পার হবে, স্রোতের টানে নদীর তলদেশে বহুদূর সরে যাবে ডুবে যাওয়া লঞ্চ। আর সেটি কোথাও আটকে গেলে দ্রুত পলির নিচে ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে লঞ্চটির অবস্থান সনাক্ত করা বা লাশ উদ্ধার কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। দ্রুত লঞ্চটি সনাক্ত করতে চট্টগ্রাম থেকে জরিপ-১১ নামে একটি বিশেষায়িত জাহাজ আনা হচ্ছে বলে জানান নৌমন্ত্রী শাজাহান খান।
সকালে তিনি মাওয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল থেকে লঞ্চটিকে ট্রেস করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আপনারা তো দেখছেন নদীর অবস্থা। যে জায়গায় লঞ্চটি ডুবেছিল, সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া স্রোতের কারণে পলির তলায় তলিয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। মন্ত্রী জানান, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের বিশেষায়িত জাহাজ জরিপ-১১ বেলা ১১ টা নাগাদ মাওয়ায় পৌঁছাতে পারে। এই জাহাজ নদীর ২৫০ মিটার গভীরেও অনুসন্ধান চালাতে পারে। জাহাজটি পৌঁছালে উদ্ধার তৎপরতা আরো গতিশীল হবে বলে আশা করছি আমরা। যেখানে লঞ্চ ডুবেছে, তার আশেপাশের ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকয় নদীতে অনুসন্ধান চালানো হবে বলে নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা জানান ।
এদিকে বেলা যতো বাড়ছে, মাওয়া ঘাটে স্বজনহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। স্বজনদের খোঁজে রাতভর অর্ধশতাধিক লোক মাওয়া ঘাটের শেডের নিচে অবস্থান করেন। মঙ্গলবার সকালে সেই সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে যায়। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে নিহতদের দাফনের জন্য তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।




