নিজ কার্যালয়ে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এসে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এর আগে এই উপাচার্য আর ক্যাম্পাসে আসবেন না বলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করে প্রশাসন। দিনভর এমন উত্তাল ছিল চুয়েট ক্যাম্পাস। অবরুদ্ধ ভিসি অসুস্থ হয়ে পড়লে দফায় দফায় তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। অবরুদ্ধ রেখে তাঁর জন্য খাবারও পাঠান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
গত সোমবার সকালে আন্দোলনের মধ্যেই হঠাৎ তালা ভেঙে প্রশাসনিক ভবন-২ নামের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত ভিসি শরীফুল আলম। এর
পরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার মধ্যে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে ভিসিকে সময়সীমা বেঁধে দেন। এই সময়সীমার মধ্যে তিনি কার্যালয় থেকে বের না হলে ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা। বন্ধ করে রাখা হয় জেনারেটরের লাইনও। তখন থেকে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অন্ধকারেই অবরুদ্ধ ছিলেন ভিসি ও তাঁর সঙ্গীরা। ভিসির সঙ্গে এ সময় চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অন্তত ১১ জন ছিলেন।
এক পর্যায়ে সোমবার রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ার। তাঁকে চুয়েট মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভিসি নিজেও অসুস্থ হন দুই দফায়। কিন্তু তাঁকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে একাধিকবার প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি। শেষমেশ ডিসি-এসপি এসে তাঁকে উদ্ধার করেন।
চুয়েটে ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে এমন নজিরবিহীন ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, চুয়েটে নতুন একজন ভিসি যোগ দিয়েছেন বলে শুনেছি। বাকি বিষয়ে কথা বলতে হলে খোঁজ নিতে হবে। একই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান।
ভিসিকে তালা খুলে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে সহায়তা করেন চুয়েট ছাত্রদলের নেতারা। এর মধ্যে ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হাসান তন্ময়ও। তিনি জানান, তাঁর জীবনে এমন অন্ধকার সময় আসেনি আগে কখনও। টানা ৩০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন একটি ঘরে অবরুদ্ধ থেকে অসুস্থবোধ করছেন তিনি। রাতের খাবার খেয়েছেন ৩টার দিকে। সারারাত ঘুম হয়নি। বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের পাঠানো বিস্কুট ও কলা দিয়ে নাশতা করেন। ভিসি স্যারের বেশি কষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি। তাদের সঙ্গে থাকা সবাই দুর্বিষহ সময় কাটিয়েছেন।
অবরুদ্ধ অবস্থায় উপাচার্যের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে চিকিৎসকদের ভবনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমে চুয়েট মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক মো. সাহাবউদ্দিন এবং পরে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা টিবলু কান্তি দে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। উপাচার্য চিকিৎসকদের জানান, সকাল ১০টা থেকে তাঁর বুকে ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল, তবে পরে তা কমে আসে। প্রথম দফায় রক্তচাপ পরিমাপ ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে দুই চিকিৎসকের দেওয়া তথ্যে ভিন্নতা দেখা দেওয়ায় আবার পরীক্ষা করা হয়। এদিকে, গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে উপাচার্য তাদের অমানবিক পরিস্থিতিতে থাকার কথা উল্লেখ করে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রার্থনা করেন।
চুয়েটে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে গতকাল বিকেলে সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছান চট্টগ্রামের ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও এসপি মাসুদ আলম। এ সময় তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তারা উপাচার্যের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তালা খুলে ভিসিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায় প্রশাসন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ ভিসিকে নিতে হলে তিনি আর চুয়েটে ফিরতে পারবেন না বলে শর্ত দেন। দীর্ঘ সময় এই শর্ত নিয়ে উভয়পক্ষের আলোচনা চলে। এক পর্যায়ে প্রশাসন দাবি মানার মৌখিক আশ্বাস দিলে তালা খুলে দেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চুয়েটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব হক বলেন, ‘নতুন ভিসির সঙ্গে যারা আঁতাত করেছেন তাদের সবাইকে ছাত্রদলের প্রতিনিধি বলা যাবে না। এই ভিসি আর এই চুয়েটে আসবেন না, এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে। তারা দাবি মৌখিকভাবে মেনে নেওয়ায় তালা খুলে দেওয়া হয়েছে।’
ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিকে আমরা সম্মান জানাই। আলোচনার মাধ্যমে সেটির সমাধান আসবে। কিন্তু নবনিযুক্ত ভিসি এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসা দরকার। মানবিক দিক বিবেচনা করে এতে সাড়া দেওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের। সঙ্গে থাকা এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে পুরো কাজটি সম্পন্ন করব। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা যাতে না হয়। এই ক্যাম্পাস আপনাদের। এই চুয়েট আমাদেরও। যা হবে আলোচনার মাধ্যমে, সহিংসতার মাধ্যমে নয়।’ পরে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। চারদিকে বেষ্টনী তৈরি করে তারা মুক্ত করেন অবরুদ্ধ ভিসিকে।
সকালে সরেজমিন দেখা যায় উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা নানান স্লোগান দেন। পরে তারা উপাচার্যের ভবনে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য সকালের নাশতা পাঠান। কিছুক্ষণ পর গণমাধ্যমকর্মীরা উপাচার্য ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর বক্তব্য জানতে চান।
এ সময় উপাচার্য সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থার অবনতির কথা জানান। পাশাপাশি তিনি প্রশাসনের কাছে সহায়তা চান। উপাচার্যের ভবনের ভেতরে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতারা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১১ জনকে অবস্থান করতে দেখা যায়।
দুপুরে উপাচার্য বেশি অসুস্থ অনুভব করলে তাঁকে প্রথমে এক দফা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি দেখে দ্বিতীয় দফায় চিকিৎসকরা চিকিৎসা দেন। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে পৌঁছান চট্টগ্রামের ডিসি ও এসপি।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর তাঁর অপসারণের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে তাঁকে মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা।




