বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ১১ দলীয় জোটের আন্দোলন ঈদের পরের কোনো আন্দোলন নয়। এটি জনগণের অধিকার ও দাবি আদায়ের আন্দোলন। লংমার্চের ডাক দেওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান।
শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা যখন লংমার্চের ডাক দিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। হিস্টাসিন খাওয়ানো লাগবে। আজকে বোধ হয় কিছু রিঅ্যাকশন শুনতে পেয়েছেন। তিনি বলেন, পরিষ্কার একটা কথা বলতে চাই, আমাদের এই আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছি– আপনারা উল্টাপাল্টা করবেন, আর বিরোধী দল বসে বসে আঙুল চুষবে, এটা হবে না। এখন পর্যন্ত আঙুল আমাদের সোজা, প্রয়োজনে এটা বাঁকা হবে। আমাদেরকে বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে।
তিনি বলেন, আমরা তো এই দাবি নিয়ে রাজপথে আসতে চাই নাই, আমরা তো চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে এবং সংসদের ভেতরেই তার ফয়সালা হবে। আপনারা গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষকে অপমান করেছেন। আপনারা তাদের সাথে দেওয়া কথার সাথে গাদ্দারি করেছেন, প্রতারণা করেছেন। বিরোধী দল জনগণের সাথে প্রতারণা করবে না ইনশাআল্লাহ।
১১ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক ইনশাআল্লাহ আসবে। তবে এর সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে, ডাক তখনই আসবে ইনশাআল্লাহ। এবং আমরা কনফিডেন্ট, এই লড়াইয়ে জনগণ বিজয়ী হবে। ফ্যাসিবাদ হেরে যাবে, অপরাধীরা হেরে যাবে, চাঁদাবাজরা হেরে যাবে, দুর্নীতিবাজরা হেরে যাবে, লুটপাটকারীরা হেরে যাবে, যারা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করে তারা হেরে যাবে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আপনারা শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার চান? সাড়ে ১৫ বছরের যত হত্যাকাণ্ড, গুম হয়েছে– বিচার চান? ২৪ এর আন্দোলনের যারা বীর শহীদ, তাদের খুনিদের বিচার চান? তাদেরকে যারা গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে, সেই খুনিদের বিচার চান? বিডিআরের পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসার যাদেরকে খুন করা হয়েছে, সেই খুনিদের বিচার চান? যারা আয়নাঘর তৈরি করেছিল, তাদের বিচার চান? জল্লাদদের বিচার চান? আমরা কথা দিচ্ছি, সেই বিচার আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। আর এই সরকার যদি এই বিচার না করে, তাহলে জনগণের সরকার কায়েমের মাধ্যমে সেই বিচার আমরা তুলে আনব ইনশাআল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা পরিষ্কার একটা কথা বলি– আমাদের এই আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ নয়। এই আন্দোলন জনগণের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। আর আমরা এমন জায়গাকে নির্বাচিত করে নিয়েছি, যেই জায়গাটা আন্দোলন–সংগ্রাম–স্বাধীনতার সূতিকাগার। বীর চট্টলা থেকেই আন্দোলন আজকে শুরু হলো। আমরা কাউকে ক্ষমতা থেকে বিদায় দেওয়ার জন্য এই আন্দোলন শুরু করি নাই। কেউ যদি বিদায় নেওয়ার আমল করতে থাকে, তো আমরা কি তাদেরকে ইয়াসিন সূরা পড়ে পানি পড়া খাওয়াব? সেই পথেই সরকার হাঁটছে, আমাদের কিছু করার নেই। আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যে রাস্তা ধরে হেঁটেছে, এই সরকার একই রাস্তা ধরে হেঁটেছে।
এসময় বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, চট্টগ্রামে একজন মেয়র আছে, উনার মেয়াদ কি এখনো আছে? উনাকে কী বলব আমরা? মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়র, তাই না? এখন শুনি যে উনি যতদিন ইচ্ছা ততদিন থাকবেন। এর নাম সুশাসন, না এর নাম ফ্যাসিবাদ? আপনি আবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। জনগণের ভোটে এসে সম্মানের সাথে আপনি নেতৃত্ব দেন, আমাদের কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু ভোটে যদি জনগণ অন্য কাউকে নির্বাচিত করে, তাও আপনাকে মেনে নিতে হবে। এটা কি ফ্যাসিবাদ নয়?
জামায়াতের আমির বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দুটো ভোট দিয়েছিলেন। একটা জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটা বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে একই ব্যক্তিকে দুটি ভোট দিয়েছেন। আফসোস, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সকলেই বলেছি যে, আপনারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। যদি ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়, তাহলে গণভোটের রায় আমরা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। একথা বিএনপিও বলেছে, আমরাও বলেছি। ৬ মাস চলে গেল, বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে? জাতির সাথে তারা কী করেছে? সংকট তারাই তৈরি করেছে।
এর আগে ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ করে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে সমবেত হন। লংমার্চকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন সড়কে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ে। বিকেলে লালদিঘী ময়দানে সমাপনী সমাবেশ শুরু হয়।
সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, জনগণের দাবি আদায়ে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। এই আন্দোলন কোনো সাময়িক কর্মসূচি নয়; দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর ডা. আমির শফিকুর রহমান।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।




