ঢাকার প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। কোথায় এবং কোন কোন সড়কে এসব রিকশা চলতে পারবে, যানবাহনের কারিগরি মান ও নিরাপত্তা এবং চালকদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় নীতিমালায় নির্ধারণ করা হবে।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর ক্ষমতায় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার গ্যাস উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি । অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জ্বালানির চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছিল। জ্বালানির যথেষ্ট ভালো পরিস্থিতিতে যেতে আরও দুই বছর সময় লাগবে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এ কথা জানান।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসির খান চৌধুরী এমপি এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ের শুরুতে গণতান্ত্রিক সরকারের ছয় মাসের বিভিন্ন কার্যক্রম ও অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি দেশের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে আগুন লাগার পর সেটি মেরামত করা হয়েছে। তবে এলএনজি কার্গো সরবরাহে কিছু সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে।
তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদন ও কারখানা সচল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বকেয়া বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানার জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয় করতে এবং গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে দ্রুত গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ভোলার গ্যাস কীভাবে জাতীয় পর্যায়ে আনা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল। পাইপলাইনসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হলেও এখন দ্রুত গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতেও বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দেশের স্থলভাগে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হচ্ছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বড় ও প্রধান সড়কেও এসব যান চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এতে মানুষের যাতায়াতে কিছুটা সুবিধা তৈরি হলেও একই সঙ্গে যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের অনেকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। পাশাপাশি এসব যানবাহনের কারিগরি মান, নির্মাণ কাঠামো ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, নীতিমালায় কোন এলাকায় এবং কোন ধরনের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে, সেসব বিষয় স্পষ্ট করা হবে। একই সঙ্গে যানবাহনের মান, কারিগরি সক্ষমতা ও চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য খাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, কিশোরগঞ্জের কাটিয়াদীর জর্জ ইনস্টিটিউট স্টেডিয়ামে মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৪ জন মৎস্য পেশাজীবী, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে পদক দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি। কৃষির বিভিন্ন খাতের মতো মৎস্য খাতেও দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টিও জানানো হয়। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নে ৪৫৭ জন উপকারভোগীর হাতে কার্ড তুলে দেওয়ার মাধ্যমে দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরে দেশের ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য সরকারের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছালে তারা তা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাজারে ব্যয় করবেন। এর ফলে বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় দেওয়া অর্থের বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লে নতুন ব্যবসা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কেবল দরিদ্র মানুষের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি নয়; এর মাধ্যমে একদিকে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে চাহিদা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবার দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও প্রতিবছর এর আওতা আরও বাড়ানো হবে।




