রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
প্রচ্ছদঅর্থ ও বানিজ্য সময়আহসান এইচ মনসুরের জেদে দেশের ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি!

আহসান এইচ মনসুরের জেদে দেশের ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি!

বাজারজুড়ে ঘুরছে হাতবদল হওয়া পচা, ছিঁড়ে যাওয়া, টেপ মারা এবং জরাজীর্ণ সব কাগুজে নোট। ব্যাংকের এটিএম বুথ কিংবা কাউন্টার থেকে টাকা তুললেও হাতে আসছে পুরোনো ও ব্যবহার অনুপযোগী নোট। অথচ এই তীব্র জনভোগান্তির বিপরীত চিত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্ট এবং দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লি.-এর (টাঁকশাল) প্রেসে অলস ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত প্রায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট।

কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা ও রাজনৈতিক অস্পষ্টতার কারণে প্রস্তুত কিংবা আংশিক প্রস্তুত থাকা এসব নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে না, যার ফলে রাষ্ট্র ইতোমধ্যেই প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অংশ বিশেষ গিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত টাকার ওপর। তিনি সব বণিজ্যিক ব্যাংকে চিঠি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত টাকা বাজারে ছাড়তে নিষেধ করেন। শুধু তা-ই নয়, নির্ধারিত সময়ের (১৮ মাস) আগেই বঙ্গবন্ধুর ছবি বাদ দিয়ে নতুন নকশার টাকা ছাপিয়ে বাজারে আনতে এক ‘তুঘলকি’ প্রস্তুতি ঘোষণা করেন। নির্ধারিত সময়ের আগে টাকা বাজারে আনতে গিয়ে হয় নানা বিপত্তি। ভুল ছাপা (টাকার নম্বরে) ও মানসম্মত না হওয়ায় নোট বাজারে ছাড়া সম্ভব হয়নি। তার ফলস্বরূপ রাষ্ট্রকে আজ বহন করতে হচ্ছে শত শত কোটি টাকার লোকসান। আংশিক ছাপানো প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা এখনো ভল্টেই পড়ে আছে। অন্যদিকে নিম্নমানের ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে প্রতিদিনই বাজারে ভোক্তাদের ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের নানাবিধ অস্থিরতা, কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণের গুঞ্জন এবং ইসলামী ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকে তৈরি হওয়া সংকট গ্রাহকদের মধ্যে এক গভীর আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়ে যায়। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের কাছে রাখা নিরাপদ মনে করায় বাজারে নগদ অর্থের চাহিদা ও সংকট উভয়ই একযোগে বাড়তে থাকে। গত কোরবানি ঈদের পর কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকেই ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ উত্তোলন করা হয়।

চাহিদার অনুপাতে বাজারে নতুন নোটের সরবরাহ না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একপর্যায়ে পুরোনো ও ছিঁড়ে যাওয়া নোট, যা স্বাভাবিক নিয়মে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা, তা-ই পুনরায় বাজারে ছেড়ে দিয়ে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ থেকেও অচলপ্রায় নোট বের হওয়ার অভিযোগ করছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। অনলাইন লেনদেন বা এটিএম বুথে তাৎক্ষণিক টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ না থাকায় এই ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হঠাৎ নতুন নোট বন্ধ করে দেওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে ছাপানো টাকা ব্যবহার না করে অপচয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও টাঁকশালের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া নীতিগত জটিলতায় বিপুল পরিমাণ টাকা প্রেসে আটকে আছে।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, প্রেসে আংশিক ছাপানো, অর্ধসমাপ্ত এবং শেষ ধাপে পৌঁছানো নোটের মোট অঙ্ক প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব নোটের কাগজ, নিরাপত্তা সুতা, বিশেষ কালি আমদানি এবং প্রাথমিক ছাপার বিভিন্ন ধাপে সরকারের ইতোমধ্যে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ব্যাংকনোটের নকশা ও সিকিউরিটি ফিচার পরিবর্তন করে নতুন টাকা বাজারে আনতে স্বাভাবিকভাবে কমপক্ষে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তড়িঘড়ি করে মাত্র আট মাসের মধ্যে নতুন ডিজাইন ও ছাপার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানে বানানের ভুল ও ছাপাজনিত ত্রুটি দেখা দেয়, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যদি এই আংশিক বা পুরো প্রস্তুতকৃত নোটগুলো বাজারে না ছাড়া হয়, তবে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া ২৫০ কোটি টাকার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় ক্ষতির খাতায় জমা হবে।

প্রথমে জানানো হয় যে বিদায়ী নোটের ডিজাইন পরিবর্তন করা হবে না এবং গভর্নরের স্বাক্ষর যুক্ত করে তা ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত নতুন নোটের কাজ হুট করে স্থগিত করতে বলা হয়।

২০২৫ সালের ১০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ব্যাংকে থাকা বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত নতুন নোট গ্রাহকদের মাঝে বিনিময় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গচ্ছিত নোটগুলো সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়। এই নির্দেশের পর থেকে বাজার থেকে নতুন নোটের সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক সংস্কারে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও এই অব্যবহৃত টাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটছে।

বর্তমানে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে নতুন টাকা ছাপানোর বিষয়ে নির্দেশনা চাওয়া হয়। সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউর রহমান বা বেগম খালেদা জিয়ার ছবিসংবলিত নতুন নোট ছাপানোর বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

তিনি জানান, তার পরিবারের কোনো সদস্যের ছবি ব্যবহার করে বাজারে নতুন নোট ছাড়ার প্রয়োজন নেই। বরং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও সময়ক্ষেপণ এড়িয়ে বর্তমান নোটের মূল কাঠামো ও সার্বিক নকশা বজায় রেখে মুদ্রণ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেন তিনি। এর ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিকৃতি নিয়ে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তার প্রশাসনিক নিরসন ঘটেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আর্থিক খাতের গবেষকরা মনে করছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত প্রস্তুতকৃত নোট আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল বা নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে স্রেফ নীতিগত দোলাচলের কারণে এত বিশাল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় সম্পদ গুদামে ফেলে রেখে ২৫০ কোটি টাকার অপচয় ঘটানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিবছর দেশে গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের প্রয়োজন হয়, যার পেছনে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। গত দুই বছরে পর্যাপ্ত টাকা না ছাপানোয় এবং ১৮ মাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটায় বাজারে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে প্রস্তুত থাকা নোটগুলো ব্যবহার করাই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান।

বিদ্যমান অচল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে এবং বাজারের স্বাভাবিক লেনদেনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আংশিক ও সমাপ্ত অবস্থায় থাকা নোটগুলো সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি। নতুন টাকা সরবরাহের মাধ্যমে বাজার থেকে পুরোনো, ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট দ্রুত তুলে নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক ভোগান্তি কমাতে ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে নতুন ও পরিচ্ছন্ন নোট দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনভোগান্তি লাঘবের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে টাঁকশালে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ নতুন নোট বাজারে ছাড়ার বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন তারা। – বার্তা ২৪.কম

আরও পড়ুন

সর্বশেষ