আওয়ামী লীগ আমলে নানা ক্ষেত্রে ছিল সিকদার পরিবারের দাপট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ২০০৯ সালে জয়নুল হক সিকদার ন্যাশনাল ব্যাংক দখল করে গড়ে তোলে রাজত্ব। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংকটি থেকে একে একে ছয় এমডিকে বিদায় করা হয়। আইন ভেঙ্গে সিকদার পরিবারের ৫ জন সদস্য ব্যাংকটির পরিচালক হয়ে যান। এভাবে ব্যাংকটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালকদের সমঝোতার ঋণ, কমিশন নিয়ে ভুয়া ঋণ, বেনামি ঋণ কিংবা উচ্চ দরে ব্যাংকের কাছে ভবন ভাড়া দিয়ে টাকা কামানো যেন এই পরিবারের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি সিকদার পরিবারের সদস্যদের কয়েকজনের মৃত্যুতে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণের কী হবে সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এ নিয়ে ব্যাংকগুলো চিন্তিত। কেননা, দেশে তাদের যে সম্পদ রয়েছে ঋণের তুলনায় তা সামান্য।
ন্যাশনাল ব্যাংক দখলের পর থেকে সিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার চেয়ারম্যান হন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মনোয়ারা সিকদার যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছেন। তাদের সাত সন্তানের মধ্যে প্রধানত দেশের সব কিছু দেখাশোনা করতেন রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। গত ৪ মে দুবাইর একটি হাসপাতালে মারা গেছেন রন হক সিকদার। আরেক ভাই রিক হক সিকদারও হাসপাতালে ভর্তি বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর এই পরিবারের কাউকে আর দেশে দেখা যায়নি। জয়নুল হক সিকদারের মেয়ে পারভীন হক সিকদার আওয়ামী লীগের সময়ে সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সিকদার গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ১১টি ব্যাংকে ঋণের তথ্য পেয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা ঋণ চিহ্নিত হয়। সব মিলিয়ে এখন এ পরিমাণ ঠেকেছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায়। বিভিন্ন উপায়ে নেওয়া ঋণের বড় অংশই পাচার করে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এসব দেশে তাদের হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে।
সরকার শেখ হাসিনা পরিবার ও সিকদার গ্রুপসহ দশ ব্যবসায়ী গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার নিয়ে যৌথ তদন্ত দল গঠন করে কাজ করছে। তদন্ত দল এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে সিকদার পরিবারের সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। সিকদার পরিবারের কারণে সমস্যায় পড়া ১১টি ব্যাংক চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ তালিকায় ন্যাশনাল ব্যাংক ছাড়া রয়েছে– ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, এক্সিম, প্রিমিয়ার, এবি, আইএফআইসি, জনতা এবং অগ্রণী ব্যাংক।
জানা গেছে, সিকদার গ্রুপের পাচারের অর্থ ফেরত আনার আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদেশি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তি করেছে অগ্রণী, আইএফআইসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। সিকদার পরিবারের হাতে যাওয়ার পর থেকে ব্যাংকটির চরম অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে দুই ভাইয়ের সঙ্গে বোন পারভীন হক সিকদারের দ্বন্দ শুরু হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ব্যাংকটি থেকে সিকদার পরিবারের সব সদস্যকে বের করে দেওয়া হয়।
সিকদার পরিবারের পতনের শুরু ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে মারা যান জয়নুল হক সিকদার। কভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর সন্তানদের বিবাদ ঠেকাতে গ্রুপটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ৪ মে আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এ দম্পতির সন্তান ও সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রন হক সিকদার। দেশটির একটি হাসপাতালে বর্তমানে রনের ভাই রিক হক সিকদারও চিকিৎসাধীন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিকদার পরিবারের ১৪ সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয়। ওই সময় বেঁচে থাকা তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার ছাড়াও রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদার, দীপু হক সিকদার, মমতাজুল হক সিকদার, নাসিম সিকদার ও লিসা ফাতেমা হক সিকদার ছিলেন তালিকায়। এ ছাড়া ছিলেন নাসিম সিকদারের মেয়ে মনিকা খান সিকদার, রিক সিকদারের দুই ছেলে শন হক সিকদার ও জন হক সিকদার, তাদের পরিবারের সদস্য সালাহউদ্দিন খান, জেফরী খান সিকদার ও মেন্ডি খান সিকদার।
প্রয়াত জয়নুল হক সিকদার সপরিবারে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হয়েছিলেন আশির দশকের শুরুতে। যদিও আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত ছিল তার। জয়নুল হক সিকদার ও তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। পাশাপাশি এ দম্পতির আট সন্তানের প্রায় সবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। এ দম্পতির তিন মেয়ে নাসিম সিকদার, পারভীন হক সিকদার, লিসা ফাতেমা হক সিকদার। এর মধ্যে কেবল পারভীন হক সিকদার বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাকি দুই কন্যা স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। জয়নুল হক সিকদারের পাঁচ ছেলের মধ্যে সবার বড় মমতাজুল হক সিকদার। অন্য ছেলেরা হলেন নিক হক সিকদার, দিপু হক সিকদার, রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। দেশের বাইরে অবস্থান করলেও এ দম্পতির সব সন্তানই সিকদার গ্রুপের পরিচালক। পাশাপাশি জয়নুল হক সিকদারের নাতি-নাতনিদের মধ্যে মনিকা সিকদার, মেন্ডি সিকদার, জেফ্রী সিকদার, জোনাস সিকদার, সিন হক সিকদার, জন হক সিকদারও শিল্প গ্রুপটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। যদিও তাদের কেউ বাংলাদেশে বসবাস করেন না। আর সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
৪ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মারা যাওয়া রন হক সিকদার ছিলেন পরিবারটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বেপরোয়া সদস্য। ২০২০ সালে এক্সিম ব্যাংকের তৎকালীন এমডিকে গুলি করে ভয় দেখানোর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্যমতে, এ ব্যাংকটি থেকেও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন রন ও রিক। এসব ঋণ অনেক আগেই অনিয়মিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। শুধু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেই এ দুই ভাই বিদেশে খরচ করেছেন ৭১ কোটি টাকার বেশি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোর কোনো ক্রেডিট কার্ডের অনুকূলে জামানতবিহীন সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ও জামানতসহ সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার ঋণসীমার সুযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে এ দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে ৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এতে রন-রিক ছাড়াও বেসরকারি ব্যাংকটির সাবেক তিন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) পাঁচ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। দুদকের পরিচালক মো. বেনজীর আহম্মদ বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডে সিকদার পরিবার ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এক কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ডলার পাচার করে বলে তথ্য উঠে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে। ক্রেডিট কার্ড ছাড়াও ন্যাশনাল ব্যাংকের হিসাব থেকে থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে দুদকের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধান প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, থাইল্যান্ডে রন হক সিকদার ও রিক হক সিকদারের নিজ নামে এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত ২০টি ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে। এছাড়া আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড, চীন, ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও রাশিয়া থেকে হিসাবগুলোয় অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২০২০ সালে এক্সিম ব্যাংকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন করে সিকদার গ্রুপ। জামানত ছাড়া বিপুল অঙ্কের এ ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন রন হক সিকদার ও তাঁর ভাই দীপু হক সিকদার।
সিকদার পরিবারের খারাপ আচরণের কারণে একে একে পাঁচজন এমডি পদ হারানোর পর ব্যাংকটি আর এমডি খুঁজে পাচ্ছিল না। বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিশিষ্ট ব্যাংকার মেহমুদ হোসেন দুই বছরের জন্য এমডি পদে যোগদান করেন। তবে এক বছর এক মাসের মাথায় বনানীর সিকদার হাউসে ডেকে নেন রন হক ও রিক হক সিদকার। সেখান থেকে ফিরে পদত্যাগ করেন তিনি।
গত মাসে জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় থাকা সিকদার গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান হলো পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড ও সিএলসি পাওয়ার।




