একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরাসরি যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি, তাদের মধ্যে মুজিবনগর সরকার, বীরাঙ্গনা এবং মুক্তিযুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসকদের সহায়কদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর বাইরে অন্যদের মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে রাখা হয়েছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধন করে মঙ্গলবার (৪ জুন) রাতে নতুন অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে প্রকাশ করা অধ্যাদেশে এসব নেতার পরিচয় ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিন রাত ১১টার দিকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, খসড়া নিয়ে কয়েক দফা উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ শর্তসাপেক্ষে এটি অনুমোদন করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাইয়ের পর খসড়াটি চূড়ান্ত করে অধ্যাদেশ জারির জন্য পাঠানো হয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে অধ্যাদেশটি জারি হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা শিগগিরই হালনাগাদ করা হবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল প্রণীত খসড়া থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অধ্যাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা অর্থ যাহারা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামেগঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়াছেন এবং যে সকল ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাহাদের নাম অর্ন্তভুক্ত করিয়াছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছেন, এই রূপ সকল বেসামরিক নাগরিক উক্ত সময়ে যাহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স (ইপিআর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্য এবং বাংলাদেশের নিম্নবর্ণিত নাগরিকগণও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইবেন, যথা (ক) হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাহাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিত সকল নারী (বীরাঙ্গনা) এবং (খ) মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ফিল্ড হাসপাতালের সকল ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসা-সহকারী।
মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধ’ অর্থ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ।”
১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ‘বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২’ জারি করেন। ওই বছরের ২৩ মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারি করা হয়। এই আদেশবলে ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ৪৬৯-এর (জাতীয় পরিষদে ১৬৯, প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০) মধ্যে ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় গণপরিষদ। ৪০৩ জনের মধ্যে ৪০০ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের, একজন ছিলেন ন্যাপের আর দু’জন নির্দলীয়। স্বাধীনতার পর প্রণীত বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৬১ জনকে ‘লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা’ শ্রেণিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ গণপরিষদের সদস্যও আছেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বর্তমানে ৩৬টি শ্রেণি রয়েছে। অধ্যাদেশ জারি হওয়ার ফলে ‘লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা’ ক্যাটেগরি থেকে গণপরিষদ সদস্য, বিসিএস ধারণাগত খেতাবপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিশ্বজনমত গঠনকারী প্রবাসী সংগঠক, মুজিবনগর, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় বাতিল হয়ে গেছে।




