বিভিন্ন ছাড়ের কারণে অনাদায়ী অনেক ঋণ নিয়মিত দেখাতে পারছে ব্যাংকগুলো। আমদানি-রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধির ফলে কমিশন আয় বেড়েছে। আবার বিভিন্ন সেবার বিপরীতে চার্জ বাড়িয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে বেশিরভাগ ব্যাংকের। অবশ্য ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত কী হারে লভ্যাংশ দিতে পারবে- এই মুনাফার ভিত্তিতে তা বলা যাবে না।
পরিচালন মুনাফা ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এখান থেকে ঋণের শ্রেণিমান বিবেচনায় নির্ধারিত হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত হারে করপোরেট কর পরিশোধের পর নিট মুনাফার হিসাব হয়। নিট মুনাফার ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। অনানুষ্ঠানিক সূত্রে ১২টি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মধুমতি ছাড়া অন্য সব ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে।
home
বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৫
বাংলাদেশ
সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব
মূল্যস্ফীতি না কমলেও অনেক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা অস্বাভাবিক বেড়েছে
ইমামূল হাছান আদনান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার ২ জানুয়ারী ২০২৫, ০১:৫৯
ছবি : বণিক বার্তা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলে দফায় দফায় ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৫ থেকে বাড়িয়ে উন্নীত করা হয় ১০ শতাংশে। ব্যাংক ঋণের সুদহারও সর্বোচ্চ ৯ থেকে বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় ১৬ শতাংশে ঠেকেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলে দফায় দফায় ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৫ থেকে বাড়িয়ে উন্নীত করা হয় ১০ শতাংশে। ব্যাংক ঋণের সুদহারও সর্বোচ্চ ৯ থেকে বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় ১৬ শতাংশে ঠেকেছে। সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এ প্রেসক্রিপশন দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বহুজাতিক দাতা সংস্থাটির এ প্রেসক্রিপশন মানতে গিয়ে দেশে বেড়ে গিয়েছে ‘কস্ট অব ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এসে উল্টো আরো উসকে উঠেছে।
সুদহার বাড়ানোর এ প্রেসক্রিপশন দেশের সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণে না এলেও এর সুফল বেশ ভালোভাবেই ঘরে তুলে নিয়েছে দেশের কিছু ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আর্থিকভাবে সবল থাকা প্রায় সব ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতভাগেরও বেশি।
বিদায়ী বছরের লাভ-ক্ষতির হিসাব গতকালের মধ্যেই চূড়ান্ত করেছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ২০২৩ সালে ব্যাংকটির এ মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে সদ্য বিদায়ী বছর ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭২ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গত বছর রেকর্ড ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। ২০২৩ সালে যা ছিল ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। এ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংক দুটির মতো দেশের অন্যান্য সবল ব্যাংকেরও পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী জানান, ‘গত বছর দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের তীব্র সংকট থাকলেও পূবালীতে সেটি ছিল না। উল্টো আমাদের ব্যাংকে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে। এ আমানত থেকে আমরা ৭ হাজার কোটি টাকা বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করেছি। ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসাবে বিতরণ করা হয়েছে। পূবালী ব্যাংকের আমদানি-রফতানি ব্যবসার প্রবৃদ্ধিও হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসবের ভূমিকা আছে।
দেশের ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার বৃদ্ধির সুফল ভোগ করছে কিনা জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংক এমডি বলেন, সেটি অন্য কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে। কারণ সুদহার বাড়ানোর পরও পূবালী ব্যাংকের ৭০ শতাংশ ঋণের সুদ ১২ শতাংশের নিচে রয়েছে। ১৪ শতাংশের বেশি সুদ আছে, এমন ঋণ ১০ শতাংশও হবে না। গত ছয় মাস আমরা কোনো গ্রাহকের ঋণের সুদ বাড়াইনি।
আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে ৬৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে সিটি ব্যাংক। ২০২৩ সালে প্রথম প্রজন্মের এ বেসরকারি ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। কিন্তু গত বছর এ মুনাফা বেড়ে ২ হাজার ২৮৭ কোটি টাকায় ঠেকেছে। ব্যাংকটির ইতিহাসে এটিই পরিচালন মুনাফার সর্বোচ্চ রেকর্ড।
পরিচালন মুনাফায় ৬১ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকও। গত বছর ব্যাংকটি ২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। যেখানে ২০২৩ সালে ডাচ্-বাংলার পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংক এশিয়া ১ হাজার ৭০০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ১ হাজার ৬৭৫ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ১ হাজার ৫০০ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ১ হাজার ১১০ কোটি, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৫০ কোটি, এক্সিম ব্যাংক ৯৭৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৮৫০ কোটি, ওয়ান ব্যাংক ৮৩০ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৬৪৪ কোটি ও চতুর্থ প্রজন্মের মেঘনা ব্যাংক ২০৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বাকি সবক’টি ব্যাংকেরই মুনাফা বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পরিচালন মুনাফার এসব তথ্য পরে কিছুটা বাড়তে বা কমতে পারে। কেননা কিছু ব্যাংক গতকালও ২০২৪ সালের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করতে পারেনি। এসব ব্যাংক থেকে পাওয়া সম্ভাব্য মুনাফার তথ্য এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় অংশ আসে ঋণের সুদ থেকে। আবার কোনো ঋণখেলাপি হলে তার বিপরীতে আয় দেখাতে পারে না ব্যাংক। তবে করোনাসহ বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদায় না করেও আয় দেখাতে পারছে ব্যাংকগুলো। করোনার কারণে ২০২০ সালে কেউ এক টাকা না দিলেও তাকে খেলাপি করা হয়নি। ২০২১ সালে যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা, এর ১৫ শতাংশ দিলেই নিয়মিত দেখানো হয়। চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিশেষ ছাড় ছিল না। তিন মাসে ১০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এরপর গত ২২ জুনের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চলতি বছর বড় ঋণের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা- জুনে ৫০, সেপ্টেম্বরে ৬০ ও ডিসেম্বরে ৭৫ শতাংশ পরিশোধ করলে আর খেলাপি হবে না। সিএমএসএমই ও কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে এ হার হবে যথাক্রমে ২৫, ৩০ ও ৪০ শতাংশ।
ব্যাংকাররা জানান, অনাদায়ী ঋণের বিপরীতে আয় দেখানোর সুযোগ এবং আমদানিতে ৪১ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানি ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে মুনাফা কিছুটা ভালো হয়েছে। মুনাফা বাড়ানোর জন্য বেশিরভাগ ব্যাংক সার্ভিস চার্জ বাড়িয়েছে। এসব না হলে মুনাফা কমত। কেননা, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার পর ব্যাংকের সুদ আয়ের হার কমছে। এখন আবার ব্যক্তি পর্যায়ের মেয়াদি আমানত ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে মূল্যস্ম্ফীতির চেয়ে কম সুদ দেওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে গত মে শেষে ঋণ আমানতে সুদহারের ব্যবধান নেমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে। গত বছরের একই মাসে যা ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল। আর ২০২০ সালের মার্চে ছিল ৪ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে গত মে মাসের পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ম্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এতে করে আগামীতে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতে সুদ আরও বাড়াতে হবে। এ রকম অবস্থায় ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখলে ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়বে কিনা এমন প্রশ্ন উঠছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ৩০ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে জানিয়েছে, আপাতত সুদহারের সীমায় কোনো পরিবর্তন আনা হবে না।




